ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে শ্রেণিকক্ষে এক শিক্ষকের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর একটি ‘অপ্রীতিকর’ ঘটনা ও তার পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষের ওই ঘটনার পর মাধ্যমিক শাখার ওই শিক্ষককে এক বিচারপতি অভিভাবকের বাসভবনে ডেকে নিয়ে অপমান করা হয়েছে।
এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা চলছে।
ওই বিচারপতির পক্ষ থেকে রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। সেখানে ওই শিক্ষকের কাছে কোচিং না করার কারণে বিচারপতির ছেলেকে মারধর করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে জিডিতে।
তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বলেছেন, কোচিং-সংক্রান্ত কোনো কারণে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, তিনি নিয়মিত কোনো কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানও না। সহকর্মীদের সন্তান থাকায় তাঁদের অনুরোধে একটি বাসায় তিনজন শিক্ষার্থী ও তাঁর নিজের উচ্চমাধ্যমিকে পড়া সন্তানকে নিয়ে পড়াতেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ওই শিক্ষার্থীও সেখানে পড়তে আসে। তবে ওই মাসের পর সে আর এখানে পড়তে আসেনি।
‘অপ্রীতিকর’ ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ এপ্রিল। শিক্ষার্থীদের দেওয়া স্মারকলিপি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন দিবা শাখার বাংলা মাধ্যমের দশম শ্রেণির একটি ক্লাসে পদার্থবিজ্ঞানের ওই শিক্ষকের কাছে বাংলা বিষয়ের একটি প্রশ্নের সমাধান জানতে চায় ওই শিক্ষার্থী। শিক্ষক তাঁকে বাংলা বিষয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে বুঝে নিতে পরামর্শ দেন। কিন্তু ছাত্রটি আরও একবার শিক্ষকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চায়। একপর্যায়ে শিক্ষক কাছে গেলে ওই ছাত্র ‘অশোভন’ আচরণ করে বলে ওই শিক্ষক ও ছাত্ররা জানায়। তখন শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দেন।
ওই শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, পরে তিনি বিষয়টি জানাতে শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফোন করেন এবং স্কুলে এসে কথা বলার অনুরোধ জানান। অভিভাবক ফোনেই বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ হওয়ায় সরাসরি আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। অভিভাবক আসবেন বলে জানান।
শিক্ষকের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ১৮ এপ্রিল তাঁকে ওই অভিভাবকের বাসায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বলেন, তিনি আশা করেছিলেন, সেখানেই বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা হবে। তবে সেখানে গিয়ে তিনি মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়েন। তাঁর সঙ্গে তখন আরেকজন শিক্ষকও ছিলেন।
ঘটনার কয়েক দিন পর বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ২৩ এপ্রিল শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। তখন ঘটনাস্থলে পুলিশ যায়। একই দিন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে স্মারকলিপি দেয় শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। রেজিস্ট্রার জেনারেলকে পরিচয় দিয়ে বার্তা পাঠালেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করান তাঁর অভিভাবক। এ ছাড়া অভিভাবকের পক্ষ থেকে বিচারপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান রমনা থানায় জিডি করেছেন। যদিও একাধিকবার চেষ্টা করেও আশিকুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জিডিতে ঘটনার পরম্পরা, ফোনে কথা বলা, প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম খানকে বিষয়টি জানানো, শিক্ষককে বিচারপতির বাসভবনে আমন্ত্রণ জানানো, কোচিংয়ে না যাওয়ার কারণে ছাত্রটিকে মারধরের অভিযোগ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্তানের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় ছাড়পত্র (টিসি) চেয়ে অধ্যক্ষের কাছে অনুরোধ ও ছাত্রটিকে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির পাওয়ার অভিযোগের কথাও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাহাৎ খান এই জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে জিডির বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে বলতে পারেননি। তিনি বলেন ফেসবুকে ভুয়া তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের কথা রয়েছে জিডিতে।