ওএমএসের চাল না পেয়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী

‘আজকেও ভিক্ষা করে খেতে হবে’

আপনজন কেউ না থাকায় ভিক্ষা করে জীবন যাপন করেন জাহানারা বেগম। ওএমএসের চাল কিনতে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টার পর চাল না পেয়ে হতাশ হয়ে কান্না করতে থাকেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ এলাকায়
ছবি: সৌরভ দাশ

‘চাল পাই নাই, আজকেও ভিক্ষা করে খেতে হবে’, এমন আক্ষেপ ঝরল পঞ্চাশোর্ধ্ব জাহানারা বেগমের কণ্ঠে। খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) ট্রাক থেকে চাল না পেয়ে চট্টগ্রাম শহরের মোগলটুলী এলাকার এই বাসিন্দা এমন আক্ষেপের কথা বললেন।

চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ সরকারি কমার্স কলেজের সামনে ওএমএস ট্রাক থেকে চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন জাহানারা। বেলা ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে চাল না পেয়ে ফিরে যান তিনি। এর আগে গত রোববারও তাঁকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল। আজ সরকারি কমার্স কলেজের সামনে তাঁর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জাহানারা বেগম বলেন, তাঁর ঘরে আজ দুপুরে খাওয়ার মতো চাল নেই। তাই সকাল আটটার দিকে ওএমএসের পণ্যে ট্রাকের সামনে এসেছিলেন তিনি। অনেকে চাল কিনতে ভোর থেকেই সারিতে ছিলেন। তবে বয়স ও নানা রোগ থাকায় এত ভোরে আসতে পারেন না বলে জানান জাহানারা। এ জন্যই গত দিনের মতো আজও চাল পাননি।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও চাল না পাওয়ার একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহানারা বেগম। তিনি জানান, পাশের মোগলটুলী এলাকায় তিনি একাই থাকেন। স্বামী কিংবা সন্তান কেউ নেই তাঁর। ভিক্ষা করেই খেতে হয়। বাজার থেকে চাল কেনার সামর্থ্য নেই। জমানো টাকা নিয়ে ওএমএসের চাল কিনতে এসেছিলেন। কিন্তু চাল না পাওয়ায় এখন আবার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে তাঁকে।

জাহানারা বেগমের মতো চাল পাননি মাঝবয়সী জানু বেগম, সেলিনা বেগম, মুক্তা আক্তার এবং তিন বছরের বাচ্চা কোলে থাকা পান্না আক্তারসহ আরও ৩৫ থেকে ৪০ জন। তাঁরা জানান, এ এলাকায় ট্রাকের পাশাপাশি ওএমএসের একটি ডিলার দোকান থাকলে কিছু মানুষ সেখান থেকে হলেও চাল কিনতে পারতেন।

কমার্স কলেজ এলাকায় খাদ্য পরিদর্শক মো. আবদুর রহমান খান বলেন, বৃদ্ধ, গর্ভবতী, প্রতিবন্ধী এবং যাঁদের কোলে শিশু থাকে, তাঁদের আগেই চাল দেওয়া হয়। ভোর থেকেই মানুষের লম্বা লাইন পড়ে যায়। চাল থাকে ৪০০ জনের কিন্তু সারিতে দাঁড়ায় ৫০০–এর বেশি মানুষ। তাই অনেককে খালি হাতে ফেরত পাঠাতে হয়।

চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে ওএমএস চালের চাহিদা আছে, এমন এলাকাগুলো হলো আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ, বিটাক ভবনের সামনে, বহদ্দারহাট পুকুরপাড়, পানির কলের সামনে ও ব্যাপারীপাড়া। এ সব এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। সপ্তাহে তিন দিন চাল দেওয়া হলেও খালি হাতে ফেরেন ৬০ থেকে ৭০ জন। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকায়ও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অন্তত ৩০ জনকে।

এসব এলাকায় খোঁজ নিয়ে যায়, বরাদ্দের তুলনায় চালপ্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা বেশি। সাড়ে চার শতাধিক মানুষ সারিতে দাঁড়ান। কিন্তু ট্রাকে থাকা চাল কেবল ৪০০ মানুষের জন্য বরাদ্দ। কেউ কেউ পরে এসে ট্রাকে উঁকি দেন। চাল পাবেন না বুঝতে পেরে ফিরে যান তাঁরা।

নগরে সপ্তাহে বর্তমানে পাঁচ দিন ওএমএস কার্যক্রম চলে। যেসব এলাকায় চাহিদা বেশি সেখানে সপ্তাহে তিন দিন ট্রাকে করে চাল বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া নগরে মোট ২১টি দোকানে পাঁচ দিন ওএমএস কার্যক্রম চলে।

চাল শেষ, এরপরও টাকা উঁচিয়ে ধরে চালের জন্য হট্টগোল করতে থাকেন লোকজন। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ এলাকায়

পরিদর্শক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায়ই এসব এলাকায় হট্টগোল শুরু হয় ট্রাক আসতে না আসতেই। এতে করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ফলে আগে এসেও অনেকে সারির পেছনে চলে যান। এ কারণে আগে এসেও অনেকেই চাল পান না। নারীদের সারিতেই বেশির ভাগ সময় হট্টগোল হয়।

চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আবদুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, নারীদের কীভাবে সুশৃঙ্খলভাবে চাল দেওয়া যায়, সেটি নিয়ে পরিদর্শকদের সঙ্গে কথা বলা হবে। তবে বৃদ্ধ, গর্ভবতী ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। চালপ্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে এখনো নির্দেশনা আসেনি।