জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভাঙচুরের শিকার হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুই দফা ভাঙচুরের শিকার হয় মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। ভেঙে ফেলা হয় ভাস্কর্যগুলো। সেগুলো এখনো মেরামত করা হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রের ভাস্কর্যের অনেকগুলোর মধ্যে একটি হলো দেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার ভাস্কর্য। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরের আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেন ১২ জন আনসার সদস্য। সেই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রের ভাস্কর্যের মাধ্যমে।
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রে ১৩ মার্চ গিয়ে দেখা যায়, সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাস্কর্যের হাতের অংশ এখনো ভাঙা। আনসার সদস্যদের হাতের রাইফেলগুলোও গুঁড়িয়ে দেওয়া অবস্থায় রয়ে গেছে। প্রায় প্রতিটি ভাস্কর্যেই আঘাতের চিহ্ন।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ও পরের কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও তাঁর নামের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে হামলার শিকার হয় মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট ভাস্কর্য, ম্যুরাল, স্মৃতিস্তম্ভ বা জাদুঘর ও বধ্যভূমিকেন্দ্রিক স্থাপনা। জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সও হামলার শিকার হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ভাস্কর্য ও সমজাতীয় স্থাপনা মেরামত করতে দেখা যায়নি। এদিকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করা বিএনপি সরকার এসব বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা ৫ থেকে ১৪ আগস্টের (২০২৪) মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলার তথ্য পেয়েছিলেন। বেশির ভাগ ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ভাস্কর্য ও সমজাতীয় স্থাপনা মেরামত করতে দেখা যায়নি। তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছিলেন, এসব ভাস্কর্যের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের পছন্দমতো নির্মাণ করা হয়েছে এবং ইতিহাসের প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনি।
এদিকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করা বিএনপি সরকার এসব বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ১৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মাত্রই দায়িত্ব পেয়েছেন। সবকিছু জেনে–বুঝে এ বিষয়ে কথা বলবেন।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের। ১৯৯৬ সালে ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্মৃতিকেন্দ্রে মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে উপস্থাপন করা হয় এবং স্থাপন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির স্মারক ভাস্কর্য।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ আগস্ট (২০২৪) বিকেলে শতাধিক মানুষের একটি দল রড, বাঁশ, হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতিকেন্দ্রে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের মাথার অংশ ভেঙে ফেলে। একই সঙ্গে ‘গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্য, পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের ভাস্কর্য, দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের বর্ণনা-সংবলিত ছোট ভাস্কর্যসহ পুরো কমপ্লেক্সেই ভাঙচুর করে।
মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রের স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে গত বছরের সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন তখনকার মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আবদুস সালাম। বিভিন্ন স্থাপনায় ৬১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে সংস্কারের টাকা বরাদ্দের অনুরোধ করা হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ টাকা দিতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র সংস্কারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তাঁদের কাছে নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হয়েছে। তবে পাওয়া যায়নি। এটি এখন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভাঙচুরের শিকার হওয়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থাপনার মধ্যে রয়েছে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার চিত্রা নদীর পাড়ে গড়ে তোলা স্বাধীনতা চত্বর ও স্মৃতিস্তম্ভ। মুক্তিযোদ্ধারা এবং সর্বস্তরের মানুষ সেখানে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদ্যাপন করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতা চত্বর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ।
প্রথম আলোর প্রতিনিধি, যশোর জানান, পরে সেই জায়গায় দোকান তুলেছিলেন দুই বিএনপি নেতা, এক যুবদল নেতা এবং বিএনপির এক কর্মী। কয়েক দিন পর সেই দোকান সরিয়ে নেন তাঁরা। এর পর থেকে জায়গাটি ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখার কাজে।
বিষয়টি নিয়ে যশোরের মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হোসেন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, স্বাধীনতা চত্বর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলায় তিনি হতবাক হয়েছিলেন, কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি চান ভেঙে ফেলা জায়গায় ভালো করে স্বাধীনতা চত্বর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়। বলা হয়েছিল, কমপ্লেক্সে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা গল্প করবেন, মতবিনিময় করবেন এবং সময় কাটাবেন। একাংশ ভাড়া দিয়ে কমপ্লেক্সের ব্যয় মেটানো হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সও ভাঙচুরের শিকার হয়।
কয়টি জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা জানতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, যেসব মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের আয় বেশি, তারা সেই আয়ের ৪০ শতাংশ অর্থ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। আর যারা নিজেদের আয়ের টাকায় কমপ্লেক্স সংস্কার করতে পারবে না, তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও কত টাকা প্রয়োজন, তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে।
জেলা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, মাঠ প্রশাসন থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে একটি তালিকা করেছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। তাতে দেখা গেছে, ১১৩টি জেলা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ভাঙচুর হয়েছে, যা সংস্কারে প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে ২৩টি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের মেরামতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেড় কোটি টাকা ছাড় করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়।
বাকি ৯০টি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স সংস্কারে ১৯ কোটি টাকা লাগবে, যা দেওয়ার মতো অর্থ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের নেই। ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সংস্কারে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে গত ৪ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংস্কারে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এসব মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সংস্কারের কাজ শুরু করতে সময় লাগবে।
অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এটা আসলে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। সরকার সিদ্ধান্ত নিলে নতুন প্রকল্প ছাড়াও অর্থ বরাদ্দ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের মেরামত সম্ভব।