গ্যাসের এই সংকটের সময় বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা। বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেট। ১১ জানুয়ারি
গ্যাসের এই সংকটের সময় বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা। বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেট। ১১ জানুয়ারি

গ‍্যাস-সংকট কাটছেই না, ভরসা এখন বৈদ্যুতিক চুলা

প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ—দুটোতেই সংকট দেখা দেওয়ায় ঢাকাজুড়ে বাসিন্দারা প্রতিদিনের রান্না চালাতে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ খুব কমে গেছে, কোথাও আবার পুরোপুরি বন্ধ। বাধ্য হয়ে অনেকেই বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। আর দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হলেও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আর নিম্ন আয়ের মানুষেরা বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা বেছে নিচ্ছেন।

ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলী, খিলগাঁওসহ আশপাশের এলাকায় হাজারো পরিবার কয়েক দিন ধরে পাইপলাইনের গ্যাস নিয়ে ভোগান্তিতে। গ‍্যাস পেলেও চাপ কম থাকায় রান্না করা যাচ্ছে না।

বেশির ভাগ পাইপলাইন গ্রাহক জানিয়েছেন, দিনে মাত্র এক-দুই ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়, তা–ও সাধারণত গভীর রাতে বা ভোরে। গ্যাস না পেলেও মাসিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার চড়া দামেও এলপিজি সিলিন্ডার সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের ভাষ্য, রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ বিল অনেকটাই বেড়ে যাবে।

আমিনবাজারে পাইপলাইন ছিদ্র হওয়ায় এক সপ্তাহ ধরে কম চাপে গ‍্যাস পাচ্ছে ঢাকাবাসী। গ্যাস না থাকায় ভোগান্তি নিয়ে বিকল্প উপায়ে মাটির চুলায় রান্না করা হচ্ছে। ছোট দিয়াবাড়ি, মিরপুর ১।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মীর হুযাইফা আল মামদূহ জানান, মঙ্গলবার থেকে তাঁর বাসায় একেবারেই গ্যাস নেই। ফলে কয়েক দিন ধরে তাঁর চুলা জ্বলেনি। গতকাল শনিবার রাতে একজন টেকনিশিয়ান পাইপলাইনে কাজ করেন। আজ সকালে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাস এসে আবার বন্ধ হয়ে যায়। রাইস কুকার দিয়ে তাঁর বাসায় কোনোরকমে এক বেলার রান্না হয়েছে।

পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দা এফ এম আনোয়ার হোসেন জানান, গত বুধবার রাত থেকে তাঁর বাসার গ‍্যাসের চুলা জ্বলছে না। বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করতে হয়। পরদিন সকালে গ্যাস এলেও চাপ কম ছিল। গতকাল শনিবার সকাল থেকে আবার গ্যাস বন্ধ হয়ে যায়। এখন তাঁরা বৈদ্যুতিক চুলা কেনার কথা ভাবছেন।

কামরাঙ্গীরচরে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে এই মাটির চুলা বানিয়ে সেখানেই রোদে শুকানো হয়, তারপর পাঠানো হয় বিক্রির জন্য।

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সাদিকুন নাহারের পরিবারটি এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল বলে জানালেন তিনি নিজেই। বললেন, সিলিন্ডার প্রায় শেষ। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার এখন ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এত দামেও পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।

এই নারী আরও জানান, কাছেই তাঁর শাশুড়ির বাসা। সেখানে গতকাল পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। সাধারণত মধ্যরাতের পর কিছু সময় গ্যাস আসে এবং সকাল সাতটার আগেই চলে যায়। এখন তাঁরা পুরোপুরি বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করছেন।

অনেকটা একই পরিস্থিতি কাঁঠালবাগানেরও। সেখানকার বাসিন্দা শাকিল হাসান বলেন, আগে সকাল নয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া না গেলেও সারা দিন কমবেশি গ্যাস পাওয়া যেত। দুই সপ্তাহ ধরে ভোর চারটার পর গ্যাস আসে এবং সকাল সাতটার দিকে বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে মগবাজারের বাসিন্দা এম এ নোমান বলেন, দোকানে সিলিন্ডার নেই। তাঁর ভবনের তত্ত্বাবধায়ক তিন দিন ধরে সিলিন্ডার জোগাড়ের চেষ্টা করেও পারছেন না।

রাজধানীর নিউমার্কেট ও বায়তুল মোকাররম মার্কেটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তীব্র গ্যাস–সংকটের কারণে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে মানুষ দোকানে ভিড় করছেন। অনেকে রাইস কুকারও কিনছেন। প্রতিনিয়ত মানুষের ভিড় বাড়ছে। অন্যদিকে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে আগে কয়েকটি জায়গায় মাটির চুলা যে পরিমাণ বানানো হতো, সে সংখ্যা এখন অনেক বেশি।

গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি জানিয়েছে, তুরাগ নদের নিচে একটি বড় পাইপলাইনের ক্ষতি এবং শেরেবাংলা নগর এলাকায় একটি ভালভ বিস্ফোরণের কারণে এই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এতে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা বিতরণ নেটওয়ার্কে আরও চাপ পড়ে রাজধানীর বড় অংশে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।