প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসির ফটক এখন এমন সুনসান থাকছে
প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসির ফটক এখন এমন সুনসান থাকছে

বিএফডিসি কমপ্লেক্স : প্রকল্প ৪ বছরের, ৭ বছর পেরিয়ে কাজ হয়েছে অর্ধেক

কবে কাজ শেষ হবে—এ প্রশ্নে জাহিদ হাসানের উত্তর এল, ‘এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের কর্মকর্তা তিনি। এই প্রতিষ্ঠানটি ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ প্রকল্পের নির্মাণকাজটি করছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমানও জানেন না, কবে নাগাদ শেষ হবে এই প্রকল্পের কাজ। হতাশ তিনি; ধারণা করছেন, প্রকল্পের মেয়াদ হয়তো আবার বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণের এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। অনুমোদনের সময় বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে প্রকল্পের কাজ। তবে কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজটি শুরুই হয় ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে কমপ্লেক্সের ভিত্তি স্থাপন হয়।

কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর ২০২৬ সালে জুন মাসে প্রকল্প শেষের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তার দুই মাস আগে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, প্রকল্পের কাজের মাত্র ৫০ দশমিক ৬৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত এ মেয়াদেও প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে না।

বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তবে কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজটি শুরুই হয় ২০২২ সালে। ২০২৬ সালে জুন মাসে প্রকল্প শেষের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রকল্পের কাজের মাত্র ৫০ দশমিক ৬৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

কমপ্লেক্সের ১২ তলার মূল ভবনের মধ্যে ১১ তলার কাজ শেষ হয়েছে। কাজের অগ্রগতি দেখে বিএফডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে চললে চলতি বছরের জুন কেন, ২০২৭ সালের জুন মাসেও প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না।

দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র বিএফডিসি এখন ধুঁকছে। অথচ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিএফডিসির আয় বছরে ৫২ কোটি টাকা হবে বলে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর অনুমোদনের সময় বলা হয়েছিল, কমপ্লেক্সটি ‘মাথা তুলে’ দাঁড়ালেই বিএফডিসির অর্থসংকটসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে বলেন, কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ হলে প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়বে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভবন নির্মাণের কাজই তো শেষ হয়নি।

আমাদের কপাল পোড়া। তিনটি ফ্লোর ভেঙে এ কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আয় আরও কমে গেছে। সরকারের কাছ থেকে ঋণ করে চালাতে হচ্ছে। বিএফডিসিকে চলচ্চিত্রবান্ধব করা তো দূরের কথা, আমরা তো নিজের পায়েই দাঁড়াতে পারছি না।
মাসুমা রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিএফডিসি

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কপাল পোড়া। তিনটি ফ্লোর ভেঙে এ কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আয় আরও কমে গেছে। কর্মীদের বেতন–বোনাস সরকারের কাছ থেকে ঋণ করে চালাতে হচ্ছে। বিএফডিসিকে চলচ্চিত্রবান্ধব করা তো দূরের কথা, আমরা তো নিজের পায়েই দাঁড়াতে পারছি না।’

প্রকল্পের কাজ চলার কারণে বিএফডিসিতে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটিকে কর্মমুখর করতে ভাড়া কমিয়ে শুটিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও কিছু হচ্ছে না।

মাসুমা রহমান বলেন, ২০১৬ সালের পর প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। নির্মাতারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ভাড়া নিতে চান না।

প্রকল্পের অধীনে কী কী হচ্ছে

ঢাকাই চলচ্চিত্রের মূল কেন্দ্র রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিএফডিসি। এর আধুনিকায়নে নেওয়া প্রকল্পে নির্মিত হচ্ছে বিএফডিসি কমপ্লেক্স।

এখানে একটি সিনেপ্লেক্স হওয়ার কথা, যেখানে থাকবে তিনটি স্ক্রিন বা হল। এ ছাড়া থাকবে শুটিং ফ্লোর, মেকআপ রুম, চলচ্চিত্র অঙ্গনের লোকজন ও সাধারণের জন্য পৃথক এন্ট্রি লবি ও রিসেপশন, স্যুভেনির শপ, ফুড কোর্ট, সুইমিং পুল, জাদুঘর ও লাইব্রেরি, ডান্সিং ফ্লোর, নাট্যমঞ্চ, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, বিশেষ চাহিদাসমপন্ন শিশু ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের কর্নার, ব্যায়ামাগার, বলরুম বা মাল্টিপারপাস হল, ভিএফএক্স স্টুডিওসহ পোস্টপ্রোডাকশনের আধুনিক সুবিধা, দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা, কলাকুশলী ও পর্যটকদের জন্য আবাসিক হোটেল, মিটিং রুম, জুস ও কফি বার, রেস্তোরাঁ, প্রদর্শনীর জায়গা, ঝরনা, শিশুদের খেলার জায়গা, প্রবীণদের গল্প করার জায়গা, সেমিনার হল, বাগানসহ আরও নানা ব্যবস্থা। এ ছাড়া কমপ্লেক্স ভবনের বেজমেন্ট ও নিচতলায় প্রায় ৩০০টি গাড়ি রাখার স্থান করা হবে। কমপ্লেক্সটি ওয়ান–স্টপ সার্ভিস সেন্টারের মতো কাজ করবে। কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়াও দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসিতে কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজটি এখনো চলছে। সম্প্রতি তোলা ছবি

তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিএফডিসি। প্রকল্প গ্রহণের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ৫১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।

ভবনের তিনটি বেজমেন্ট এবং দশম তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয় গত বছরের ১৯ অক্টোবরে। এরপর ১১ তলার ৬৩টি কলামের মধ্যে ৩৮টি কলাম ঢালাই সম্পন্ন হয়। তারপর আর কাজ এগোয়নি।

২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিএফডিসি মুনাফা অর্জন করেছিল। এরপর থেকে সংস্থাটি বাজেট–ঘাটতিতে চলছে। ২০০০ সাল থেকে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকেই লোকসান গুনছে। নিজস্ব আয়ে চলা এফডিসিকে ২০১৪ সাল থেকেই সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

কাজে ধীর গতি দেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দিয়ে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে বিএফডিসি। এরপর গত ২৫ মার্চ গিয়ে দেখা যায়, ভবন নির্মাণের কিছু কাজ শুরু হয়েছে।

চলচ্চিত্রশিল্পকে সম্প্রসারণ, সুদৃঢ় করাসহ বিএফডিসিকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও কারিগরি সুবিধা সংযোজন করে বিনোদনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা এবং নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টির মাধ্যমে বিএফডিসি তথা চলচ্চিত্রশিল্পের ভিত্তি মজবুত করাই হলো এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

তবে ভবন নির্মাণ শেষ না হওয়ায় ভবনের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, লিফট, বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, জেনারেটর স্থাপন কিছুই করা যাচ্ছে না। সিনেপ্লেক্সের যন্ত্রপাতি কেনা ও স্থাপন, ডিজিটাল মুভি ক্যামেরা, লেন্স, বিভিন্ন ধরনের লাইট, ভিএফএক্স যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়াটিও থেমে আছে।

কেন ধীরগতি

প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের কয়েক দিন এবং ৩১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ ছিল। বিএফডিসি এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা চায়। কারণ, দর্শানোর নোটিশ দেয়, তাগাদাপত্র দেয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান উত্তর দিলেও তা সংগতিপূর্ণ ছিল না।

বিএফডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্ব, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদল, প্রকল্পের জন্য একজন স্থায়ী প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, কোভিড মহামারি, অর্থছাড়ে জটিলতা—এসব কারণে নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহিদ হাসান আরও কিছু কারণ দেখান।

তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৮ সালে অনুমোদন পেলেও প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। তত দিনে মালামালের দাম বেড়ে যায় অনেক। তাই মূল্য সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রায় পাওয়া গেলেও বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ আপিল করলে আদালত স্থগিতাদেশ দেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটভূমিও কাজে প্রভাব ফেলে বলে জানান জাহিদ হাসান। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পের কোনো অর্থও ছাড় হয়নি।

এফডিসির পুরোনো ফটক

২০২৪ সালের জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন দেয়। তাতে বলা হয়, তেজগাঁও এলাকায় ৯৪ কাঠা জমির ওপর বাস্তবায়িত প্রকল্পের অগ্রগতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত মোট বরাদ্দের একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ ছাড় করা হলেও তা পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, যার অন্যতম কারণ ভবনের মূল কাজের ধীরগতি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জাহিদ হাসান বলেন, ‘অর্থ ছাড় না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে আমরা নিজেরাই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। তারপরও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

অর্থ ছাড় না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে আমরা নিজেরাই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। তারপরও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
জাহিদ হাসান, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

কমপ্লেক্সটির গুরুত্ব কতটা

১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু করা এফডিসিকে কেন্দ্র করেই ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের সূচনা হয়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত সেই প্রতিষ্ঠানটি এখন ‘মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান’।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডসহ ১১টি সংস্থার নামে প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়। শুধু বিএফডিসির জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। নিজস্ব আয়ে চলার কথা প্রতিষ্ঠানটির। সেই কারণে বিএফডিসি কমপ্লেক্সের দিকে তাকিয়ে আছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএফডিসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ভিক্ষা করে একটি প্রতিষ্ঠান আর কত দিন চলতে পারে, কমপ্লেক্সটি মাথা তুলে দাঁড়ালে কর্মীদের বেতন–ভাতার জন্য অন্ততপক্ষে সরকারের কাছে হাত পাততে হতো না।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের সূতিকাগার বিএফডিসিতে এখন সিনেমা নেই, শুধু এফডিসির সামনের ফ্লাইওভারের স্তম্ভের সিনেমার পোস্টারে পাওয়া যায় ঢাকাই সিনেমার খবর

১৯৫৯ সাল থেকে এফডিসিতে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। অ্যানালগ যুগের ৩৫ মিলিমিটার ফরম্যাটের বিভিন্ন ধরনের কাঁচা ফিল্ম যেমন সাউন্ড নেগেটিভ, পিকচার নেগেটিভ ও পজিটিভ আমদানি করে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে বিক্রি করার একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান ছিল বিএফডিসি।

চলচ্চিত্র নির্মাণসহ স্টুডিও প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানিকে ঋণ দেওয়া, চিত্রনির্মাতাদের ভাড়ার বিনিময়ে স্টুডিও ব্যবহার করতে দেওয়া, চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিবেশনা, চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা, সেমিনারের আয়োজন করা, নতুন শিল্পীর সন্ধান, চলচ্চিত্র নিয়ে উৎসব, বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য চলচ্চিত্র বাছাই, বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করা কাগজে-কলমে এফডিসির এমন অনেক কাজ রয়েছে।

তবে বর্তমানে শুটিং ফ্লোর ভাড়া বা কিছু কারিগরি সুবিধা দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান তেমন কোনো কাজ নেই। বিভিন্ন শুটিং ফ্লোর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ভাড়া নিয়ে বছরব্যাপী রিয়্যালিটি শোসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করছে।

অথচ ১৯৮৭ সালে এফডিসি থেকে প্রকাশিত অনুপম হায়াৎ-এর ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ শিরোনামের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, সরকার বিএফডিসি থেকে নির্মিত সিনেমা থেকে বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বিনোদন কর পেত।

বিএফডিসির ২০১১-১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা অর্জন করেছিল। এরপর থেকে সংস্থাটি বাজেট–ঘাটতিতে চলছে অর্থাৎ আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। মূলত ২০০০ সাল থেকে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকেই লোকসান গুনছে। নিজস্ব আয়ে চলা এফডিসিকে ২০১৪ সাল থেকেই সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এফডিসির ভেতরে থাকা পুরোনো ভবন

গত বছরের এপ্রিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে একটি প্রতিবেদন দেয় বিএফডিসি। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট–ঘাটতি ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলে মাসিক ব্যয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় মাসে গড়ে ৩০ লাখ টাকা। এফডিসির কর্মচারীরা অবসরে যাচ্ছেন, কেউ মারা যাচ্ছেন—তাঁদের পাওনা ভাতা যোগ হচ্ছে খরচের খাতায়। কর্মীদের বেতন, অবসর–উত্তর সুবিধাসহ প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নের জন্য ১১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা অনুদান/থোক বরাদ্দ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবেদন করেছিল এফডিসি।

চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল সিনেমার জগতে প্রবেশ করতে গিয়ে হোঁচট খায় এফডিসি। ২০১৪ সালে বিএফডিসিতে প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা আসে। অথচ এর আগে ২০১২ সালে দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে ডিজিটাল চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। ফলে এফডিসি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।