শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখাতে হবে বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনে। পেশাভেদে ইংরেজি ব্যবহারের ধরন আলাদা। তাই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে কী কাজ করবেন, তা বিবেচনায় নিয়ে ভাষা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, ইংরেজিতে দক্ষতার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের জ্ঞান ও যোগ্যতা কাজে লাগাতে পারেন না। এ ঘাটতি দূর করতে প্রচলিত ভাষাশিক্ষার পদ্ধতি বদলানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার এবং বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোরও পরামর্শ দেন তাঁরা।
‘ইউল্যাব-টিইএসওএল বিডি সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ইএসপি’ শীর্ষক সম্মেলনে কথাগুলো বলেন বক্তারা।
আজ শুক্রবার মোহাম্মদপুরে ইউল্যাবের স্থায়ী ক্যাম্পাসে সকাল নয়টায় শুরু হয় এ সম্মেলন। চলবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) ও টিইএসওএল সোসাইটি অব বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্রম মার্জিন টু মেইনস্ট্রিম: রিস্ট্রাকচারিং ইনস্টিটিউশনাল ইএসপি ফর সাস্টেইনেবল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট’। অর্থাৎ টেকসই জাতীয় উন্নয়নের জন্য ইংরেজি শিক্ষাকে কীভাবে নতুন করে সাজানো যায়, সেটিই সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়। এর লক্ষ্য, শিক্ষাবিষয়ক তত্ত্বের সঙ্গে দেশের বাস্তব উন্নয়নের প্রয়োজনের যোগসূত্র তৈরি করা।
কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ইংরেজি শেখানোর তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষতার বড় ঘাটতি রয়েছে। এর জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী করা যায় না। বরং ইংরেজি শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি পড়ানো হলেও শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে ভাষাটি ব্যবহারে সমস্যায় পড়ছেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, শুধু সাধারণ যোগাযোগের জন্য নয়, পেশাগত ও কারিগরি জ্ঞান অর্জনেও ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৌশল, ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জটিল বিষয় বুঝতে ইংরেজির প্রয়োজন হয়। ভাষায় দক্ষতার অভাবে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে উল্লেখ করে ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে চললে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ জনশক্তি তৈরি জরুরি। এ জন্য শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ও পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সম্মেলনের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিজিটাল ইংরেজি শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান রিয়েলিইংলিশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাইজেল কিলিক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন ইংরেজি শেখানো উচিত, যা তাঁরা বাস্তব জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারবেন। বছরের পর বছর ইংরেজি শিখেও অনেকে ভাষাটিতে কথা বলতে পারেন না। এতে সময় ও অর্থ—দুটোই নষ্ট হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অল্প খরচে ইংরেজিতে কথা বলার অনুশীলন ও তাৎক্ষণিক সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
নাইজেল কিলিক বলেন, বিদেশি পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু অনেক সময় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জীবনের সঙ্গে মেলে না। এআই দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে পাঠ তৈরি করা যায়। শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে কী কাজ করবেন, তা বিবেচনায় নিয়ে ইংরেজি শেখাতে হবে। এ জন্য ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকদের প্রকৌশল, চিকিৎসা ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ইংরেজি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ভাষাদক্ষতা গড়ে তোলা, যাতে তাঁরা কর্মক্ষেত্রে সফল হতে পারেন।
ইংরেজি শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ দরকার
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাসুমা হাবিব বলেন, ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে শুধু ব্যাকরণ ও পরীক্ষায় ভালো ফলের ওপর গুরুত্ব দিলে চলবে না; কর্মক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োজনে ইংরেজি ব্যবহারের দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের পেশাভিত্তিক ভাষাশিক্ষা দিতে হবে, যাতে তাঁরা কাজের প্রয়োজনে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন। তাই শিক্ষার্থীদের পেশাভিত্তিক ইংরেজিতে দক্ষ করে তুলতে বিশেষায়িত ভাষাশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে ইউল্যাবের উপাচার্য অধ্যাপক সামসাদ মর্তূজা বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু ইংরেজি শেখালেই হবে না, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ভাষাটি ব্যবহারের দক্ষতাও গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য পেশাভিত্তিক ভাষাশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার ও তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
উদ্বোধনী পর্বের শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজের (সিএলএস) পরিচালক ফাহিম হাসান সাহেদ। তিনি বলেন, পেশাভেদে ইংরেজি ব্যবহারের প্রয়োজন ও ধরন আলাদা। তাই শুধু ইংরেজি শেখা নয়, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ভাষাটি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ভাষাশিক্ষাকে মানুষের পেশা, প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করাই এ সম্মেলনের লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
টিইএসওএল সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ ও টিইএসওএল সোসাইটি অব বাংলাদেশের মধ্যে এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব। এর মাধ্যমে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় গবেষণা, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্বায়নের প্রভাবে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন ধারণা বিনিময়, পেশাগত যোগাযোগ জোরদার এবং ভবিষ্যতে যৌথভাবে কাজ করার পথ তৈরি করতে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।