বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

টেকসই নগরায়ণে দরকার রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত পথে এগোয়নি। উন্নয়ন পরিকল্পনায় দলীয়করণ করে দক্ষ পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে টেকসই নগরায়ণের জন্য রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আজ রোববার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নগর–পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্যে এ কথাগুলো উঠে এসেছে। ‘রাজনৈতিক চর্চায় পরিকল্পিত নগরায়ণ’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সহযোগিতায় ছিল নেদারল্যান্ডস দূতাবাস।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান। তিনি বলেন, দেশ পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সেই লক্ষ্যে পরিকল্পিত নগর নির্মাণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সঙ্গে পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

এই নগর–পরিকল্পনাবিদ বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে নির্মিত পরিবেশের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে। জলবায়ু ঝুঁকি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিআইপির কারিগরি সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন। ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ঢাকাকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত নগরায়ণের মূল সংকট হলো সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থার অভাব। ট্রেন, বাস ও নৌপথকে যুক্ত করে বহুমাধ্যম যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন চালুর মাধ্যমে ট্রাফিক ও পরিবেশ সংকট কমানো সম্ভব।

মাহদী আমিন আরও বলেন, বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া নগর সংকটের সমাধান হবে না। শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ, পার্ক ও সবুজ জায়গা নিশ্চিত না হলে সামাজিক অবক্ষয় ও মাদক সমস্যা বাড়তেই থাকবে। এ ছাড়া মেগা প্রকল্পভিত্তিক দুর্নীতির রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশীয় পেশাজীবীদের নিয়ে অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিমূলক উন্নয়নই বিএনপির লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী পার হলেও বাংলাদেশ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি। মানুষের শক্তি থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের কারণে রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত পথে এগোয়নি। এই বাস্তবতায় একটি নির্মোহ পর্যালোচনা ও সত্যিকারের সুষ্ঠু নির্বাচন জরুরি।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বক্তব্য দেন। ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি

জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, দেশের সংকটের মূল কারণ পেশাদারির বদলে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া। দক্ষতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়ে দায়িত্ব দেওয়ায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এসেছে, ব্যয় বেড়েছে, জবাবদিহি হারিয়েছে। এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না।

এ সময় বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, পরিকল্পনাবিদদের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও নগর-পরিকল্পনায় শ্রমজীবী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে বাদ দিলে তা টেকসই হবে না।

উচ্ছেদকেন্দ্রিক নগরায়ণের বিরোধিতা করে সাইফুল হক বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নগর সংকট বাড়িয়েছে। করোনা ও অন্যান্য দুর্যোগে এই ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে। রাজনীতিক ও পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয় ছাড়া বাসযোগ্য নগর সম্ভব নয়।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ঢাকা শুধু উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নয়, ঢাকা জেলা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ মোট ২৭টি সংসদীয় আসন মিলেই ঢাকা। যেখানে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ বাস করে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সর্বোপরি মানবিক নগর গড়ে তোলা।

আরিফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট হলো ইন্টিগ্রেটেড গভর্ন্যান্সের অভাব। বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় সমস্যা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ভূমি দখল ও প্রভাবশালী আবাসন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। এসব মোকাবিলায় নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করে রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি

অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজনৈতিক দল ও এর নেতাদের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধের অঙ্গীকার করতে হবে। কেননা তাঁরাই পরিকল্পনাকে সবার আগে গলা টিপে হত্যা করেন। কোনো কোনো রাজনীতিবিদ ও তাঁদের ব্যবসায়িক অংশীদারেরা মিলে পরিকল্পনাকে ধ্বংস করেন এবং দূষণ ছড়িয়ে দেন। তাই রাজনীতিবিদেরা যদি প্রতিশ্রুতি দেন যে তাঁরা কোনো ধরনের পরিকল্পনা লঙ্ঘন করবেন না, তাহলেই বাংলাদেশের সমস্যা অনেকটুকু সমাধান হবে।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক মু. মুসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক আকতার মাহমুদ। এ সময় আরও বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ আশরাফুল আলম, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইপির সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।