রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের মাঠে জাতীয় ফল মেলায় আগ্রহীদের ভিড়। বৃহস্পতিবার বিকেলে তোলা
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের মাঠে জাতীয় ফল মেলায় আগ্রহীদের ভিড়। বৃহস্পতিবার বিকেলে তোলা

তিন দিনব্যাপী ফল মেলা শুরু

কাঁঠালের বিরিয়ানি, বার্গার, চিপস, পেস্ট্রির পাশাপাশি রয়েছে নানা ফলের প্রদর্শনী

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত মৌসুমি ও অপ্রচলিত ফলের পাশাপাশি ফলভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য নিয়ে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন মাঠে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলা-২০২৬। আজ বৃহস্পতিবার সকালে মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। কৃষক, উদ্যোক্তা ও কৃষি–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে আগামী শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত।

এবারের মেলায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ৭৬টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বিনা) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উৎপাদিত নানা পরিচিত ও অপরিচিত ফল, জাত, উৎপাদন কৌশলসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কৃষি প্রতিষ্ঠান থেকে সব ধরনের ফল কিনতে পারছেন দর্শনার্থীরা।

জাতীয় ফল মেলায় প্রদর্শন করা নানা ধরনের ফল

মেলায় ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়বে কৃষি সম্প্রচারণ অধিদপ্তরের স্টল। এই স্টলে প্রদর্শিত ফলের মধ্যে অধিকাংশই আম। সেখানে প্রায় ৮০ প্রজাতির আম রয়েছে। এ ছাড়া স্টলটিতে রয়েছে কাঁঠাল, আনারস, খেজুর, লিচু, ড্রাগন, তরমুজ, বেল, কোকো, করোসল, লুকলুকি, কাজুবাদাম, বিলাতি গাব, শরিফা, মাল্টা, আমলকী, আঁশফল, পার্সিমন, ডুমুর, বিলিম্বি, থাই লংগান, অ্যাভাকাডো, জামরুল, তৈকর, রাম্বুটান, লটকন, আলুবোখারা, সাতকরা, বাতাবিলেবু, জারা লেবু, গাব, করমচা, থাই কাউফল, চাপালিশ, ডেউয়া, কামরাঙা, ট্যাংক ফল, সফেদা, জাম, গোলফলসহ নানা দেশি–বিদেশি ফল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. জামিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মেলায় সব ধরনের দেশি-বিদেশি ফলের প্রদর্শনী ও বিক্রি হচ্ছে। সব ধরনের ফল রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মেলায় তাঁদের স্টলে শুধু আমই রয়েছে ৮০ জাতের বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি ফল রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্টলে তাঁদের উদ্ভাবিত বারি জাতের নানা ফল প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন ফলের জেলি, আচার, আমসত্ত্ব, কাঁঠাল ও কলার চিপস, কাঁঠালের ভেজিটেবল মিট, রান্নার উপযোগী কাঁঠাল স্লাইস। এই স্টলে কাঁঠাল, কলা, নারকেল, লেবু, পেঁপে, গাব, আমলকী, আতা, বাতাবিলেবু ও আমের একাধিক জাত প্রদর্শন করা হচ্ছে।

জাতীয় ফল মেলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে কাঁঠালের বিরিয়ানি ও বার্গার

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আরেকটি স্টলে প্রদর্শন করা হচ্ছে কাঁঠাল থেকে উৎপাদিত নানা পদের খাবার। যেমন কাঁঠালের বিরিয়ানি, বার্গার, চিপস, পেস্ট্রি, কাবাব, পাকোড়া, হালুয়া, নকশিপিঠা, ললিপপ, রুটি, শাশলিক, পিঠা, পুডিং, বড়া, কেক, পাটিসাপটা, কাটলেট। পাশাপাশি রয়েছে তালের পায়েস, পিঠা, বড়া, ডাবের পুডিং, তরমুজের পুডিং, আমের পুডিং, আমের পিঠা, আমের ঝুরি, আমলকীর ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন ধরনের শুকনা খাবার।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাহ আজমাইন হাবীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ধরনের ফল প্রদর্শনীর পাশাপাশি এসব ফল থেকে উৎপাদিত নানা পণ্যও প্রদর্শন করছি। মূলত ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আগ্রহ জাগানোর চেষ্টা করছি।’

মেলায় আমের আঁটি, হলুদ, বিভিন্ন গাছের বাকল থেকে উৎপাদিত প্রাকৃতিক সাবানের স্টল নিয়ে বসেছেন নারী উদ্যোক্তা ফিরোজা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে পাওয়া সাবানে কেমিক্যাল থাকে। আমাদের সাবানে কোনো কেমিক্যাল নেই। প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি করা হয়।’

২০ জাতের উচ্চফলনশীল আম ও ৫ জাতের লিচুর প্রদর্শনী করছে দিনাজপুরের বিরলের শাহরিয়ার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান

‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’ স্লোগানে শুরু হওয়া এবারের মেলায় বিএডিসির স্টলে আম, জাম, কাঁঠালসহ ১৪১ ধরনের ফলের প্রদর্শন করা হচ্ছে। বিএডিসির উপপরিচালক (রপ্তানি) আবু রেজা মো. মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের উদ্ভাবিত এসব ফল কোনো কৃষক বা উদ্যোক্তা উৎপাদন করতে চাইলে সারা দেশে আমাদের ২৪টি অফিস থেকে চারা বা কলম সংগ্রহ করতে পারবেন।’

মেলায় আমের বিস্কুট, আমের পিঠা, নাগা মরিচের আচার, আমের মিষ্টিসহ ১৬ পদের খাবার প্রদর্শন ও বিক্রি করছে আমের ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল বডির সহায়তায় পরিচালিত রসালো অ্যাগ্রো ফুডস অ্যান্ড ম্যাঙ্গো ফার্ম। প্রতিষ্ঠানের মালিক মাসুদ পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, নতুন এসব খাবার নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে। পণ্যগুলোর দাম কমিয়ে মানুষের হাতের নাগালে আনতে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

২০ জাতের উচ্চফলনশীল আম ও ৫ জাতের লিচুর প্রদর্শনী করছে দিনাজপুরের বিরলের শাহরিয়ার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্টলটিতে মিয়াজাকি, কিং অব চাকাপাত, পুষা উরনিম, রেট পাল মারসহ নানা জাতের আম রয়েছে। এসব আমের চারা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়; আর লিচুর চারা বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। প্রতিষ্ঠানের মালিক আনসার আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ২০ জাতের আম ও ৫ জাতের লিচু প্রদর্শন করছি। এসব চারা আমাদের কাছ থেকে কৃষক বা উদ্যোক্তারা কিনতে পারবেন।’

জাতীয় ফল মেলায় প্রদর্শন করা নানা ধরনের ফল

মেলার ২৩ নম্বর স্টলে মাশরুমের নানা পণ্য বিক্রি ও প্রদর্শন করছে জমজম মাশরুম ফুড। সেখানে রয়েছে মাশরুমের চা, জুস, রোল, কাপ কেক, বেণি পিঠা, মিষ্টি, নাড়ুসহ নানা সামগ্রী। আর মাশরুমের চিপস বিক্রি করছে টেস্টি মাশরুম নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাস্টার অ্যাগ্রো ফার্মের স্টলে প্রদর্শন করা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আম ব্রুনাই কিং, মিয়াজাকি, থাইল্যান্ডের চাকাপাত, আমেরিকার পালমারসহ নানা জাতের আম, এলাচি, বনকাঠি, কাজুবাদামসহ নানা ফল। প্রতিষ্ঠানটি এসব জাতের চারা ও কলম বিক্রি করছে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা রায়হান কবীর।

ছয় বছরের শিশু আরহামকে নিয়ে মেলায় এসেছেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করা মো. ওয়াহিদুজ্জামান সরকার। প্রদর্শনী দেখে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে অনেক জাতের ফল রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে শিশুরা পরিচিত না। তাঁরা দেখতে পারছে, চিনতে পারছে, এটা সুন্দর আয়োজন।’ তবে মেলায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বেশি থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।