জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির এই লাইন রাজধানীর আসাদ গেটে ফিলিং স্টেশনে। আজ বুধবার দুপুরে
জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির এই লাইন রাজধানীর আসাদ গেটে ফিলিং স্টেশনে। আজ বুধবার দুপুরে

তেল ছাড়া ‘সংসার চলবে না’, তাই খাওয়া বাদ দিয়ে লাইনে

সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, তা নিয়ে অভিযোগ নেই সাইফুল ইসলামের। তাঁর প্রশ্ন, ফিলিং স্টেশনে লাইন কবে শেষ হবে। কারণ, লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় তাঁর আয় কমে গেছে।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে আজ বুধবার বিকেল পাঁচটায় কথা হয় সাইফুলের সঙ্গে। নিজের মোটরসাইকেলে তেল নিতে বেলা দুইটায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তিন ঘণ্টায়ও ফিলিং স্টেশনে ঢুকতে পারেননি।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান সাইফুল। তেল নিয়েই তাঁকে ফিরতে হবে। তিনি বলেন, ‘তেল না পেলে তো আর সংসার চলবে না।’ দুপুরে রুটি-কলা খেয়েছিলেন, তারপর আর লাইন ছেড়ে খেতে যাননি। ‘এখন খাওয়ার চিন্তা করতে গেলে তেল পাব না,’ জানালেন তিনি। তেল নেওয়ার পরই খেতে যাবেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার ফলে ভুগতে হচ্ছে বাংলাদেশকেও। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। মজুতের সংকট আপাতত নেই, সরকার এমন কথা বললেও মানুষ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ায় চাহিদা গেছে বেড়ে। চাহিদা–জোগানের ফারাক থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশনের জ্বালানি তেল দিনের প্রথম ভাগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

সরকার ১৯ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মজুতের প্রবণতা ও ‘প্যানিক বায়িং’ কমবে বলে মনে করা হলেও এরপরও ফিলিং স্টেশনে লাইন কমছে না।

তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে আজও লাইন দীর্ঘই ছিল। তেলের জন্য ব্যক্তিগত যানবাহনের সারি পৌঁছেছিল এক কিলোমিটার দূরে বিএএফ শাহীন স্কুলের বিপরীত পাশ পর্যন্ত। মোটরসাইকেলের লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল তার চেয়ে কম, প্রায় জাহাঙ্গীর গেটের কাছাকাছি পর্যন্ত।

বিকেলে লাইনে প্রাইভেট কার ছিল ৫৩৭টি ও মোটরসাইকেল ছিল ৬৮৯টি। এ ছাড়া ৩৭টি ছোট পিকআপ ভ্যান, ১৬টি ছোট কাভার্ড ভ্যান ও ৩টি অ্যাম্বুলেন্সও ছিল তেলের অপেক্ষায়।

রাজধানীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে আজ বুধবার জ্বালানি তেল নিতে আসেন সাইফুল ইসলাম নামের এই রাইডার

রাজধানীর পূর্ব প্রান্তের মাতুয়াইল থেকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে এসেছিলেন ভাড়ায় মোটরাইকেলচালক মো. নয়ন ইসলাম। দুপুর ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। লাইনে দাঁড়িয়েই দুপুরে শিঙাড়া আর রুটি খেয়ে নেন।

নয়নও বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু তেলের জন্য এভাবে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর কাজ করা যাবে না।’

বনশ্রী এলাকা থেকে নিজের প্রাইভেট কারের জন্য তেল নিতে আসেন ব্যবসায়ী ইফতেখার মাহমুদ। বিকেলে তিনি বলেন, ‘দুপুরের পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো পাইনি।’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ধানমন্ডি থেকে আসা গাড়িচালক মো. মোখলেসুর রহমান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালান তিনি।

ট্রাস্টের মতো অতটা ভিড় দেখা যায়নি রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ফিলিং স্টেশন নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টারে। আজ দুপুরে সেখানে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা ছিল আগের দিনগুলোর তুলনায় কম।

সেখানে জ্বালানি তেলের জন্য ৭৭টি প্রাইভেট কারকে অপেক্ষায় দেখা গেছে। এ ছাড়া ১১২টি মোটরসাইকেল, ১৩টি ছোট পিকআপ ভ্যান, তিনটি ছোট কাভার্ড ভ্যান ও একটি বাসকে লাইনে দেখা গেছে বেলা একটায়।

জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির এই লাইন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে। আজ বুধবার দুপুরে

নিজের মোটর সাইকেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন রাইডার রাকিব হোসেন। এর আগে শনিবার সর্বশেষ ৫০০ টাকার তেল নিয়েছিলেন তিনি। আজ আবার আসেন।

খিলক্ষেতের বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, ‘আগে যা তেল পেয়েছি, তা আজ শেষ হয়ে গেছে। সে জন্য এখন লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। তেল পেলে আবারও বাইক চালাতে পারব। তেল না থাকলে তো আর বাইক চালানো যায় না, বাধ্য হয়েই কাজের সময়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি।’

বাইকে তেল নেওয়ার জন্য ৪০ মিনিট ধরে অপেক্ষায় ছিলেন মো. সুমন। পেশায় স্যানিটারি মিস্ত্রি তিনি। থাকেন গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায়। কাজের জন্য তাঁকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয় নিজের বাইকে চেপে।

সুমন বলেন, ‘চার দিন আগে ৫০০ টাকার তেল নিয়েছিলাম। এখন শেষের দিকে, তাই লাইনে দাঁড়িয়েছি।’ কতটুকু তেল নেবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন পাঁচশ টাকারই দেবে মনে হয়। ফুয়েল পাস থাকলে বেশি দেয়। আমার ফুয়েল পাস নেই। কাল-পরশু পাস তৈরি করব।’

নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টারের একজন বিক্রয় সহকারী বলেন, যিনি যতুটুকু চাইছেন, ততটুকু দিচ্ছেন তাঁরা।

ফিলিং স্টেশনটির ব্যবস্থাপক সোহেল রানাও বলেন, সকাল ৯টা থেকে তাঁরা তেল বিক্রি শুরু করেন; যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের মজুত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেল সরবরাহ করবেন। কোনো ‘রেশনিং’ হচ্ছে না।