
মোহাম্মদপুরে ৮-১০টি বাহিনী এখন সক্রিয় রয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত রোববার দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন নামের এক কিশোর গ্যাং নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ইমন কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’–এর প্রধান ছিলেন। ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোন নিয়ে আরেক গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে খুন হন তিনি। খুনের আগে রোববার সকালে দুই দফায় তাঁদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ। খুনের পর ওই এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।
খুনের পর থেকে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। এ ঘটনায় ইমনের মা ফেরদৌসী বেগম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রোববার ঘটনাস্থল থেকে মো. সাইফ (২৩), তুহিন (২০) ও মো. রাব্বী কাজী (২৫) আটক করা হয়। মামলা হওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর গতকাল বিকেলে মো. সুমন (২৫) নামের আরেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আটক তিনজনের কাছ থেকে তিনটি চাপাতি, একটি কাটার, স্টিলের একটি পাত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনই আরমান–শাহরুখ গ্রুপের সদস্য।
কী ঘটেছিল
সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুনের শিকার ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ১ নম্বর গেট–সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতেন। ওই এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকান, অটোরিকশার গ্যারেজ, নার্সারি থেকে চাঁদা তুলতেন তিনি। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা, চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করেন আরমান–শাহরুখ নামের আরেকটি কিশোর গ্রুপের সদস্যরা। দুই গ্রুপের সদস্যরাই আবার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ দুই সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে আগে থেকেই এ দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই রোববার এ খুনের ঘটনা ঘটে।
রোববার সকালে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে দুই দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ।
ডিএমপির গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রোববার সকালে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ইমন ও আরমান–শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোনের ভাগাভাগি নিয়েই এ মারামারি হয়। ধাওয়া খেয়ে ইমনসহ তাঁর লোকজন রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি এলাকায় এলে তাঁদের মধ্যে আরেক দফা কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিকেল চারটার দিকে আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা ইমনদের ধাওয়া দিলে তাঁরা রায়েরবাজার ঢালের ১ নম্বর গলির দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। সেখানেই ইমনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
পরে আহত ইমনকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায়। ফুটেজে দেখা গেছে, চাপাতি হাতে ইমনকে ধাওয়া করছেন প্রতিপক্ষ গ্রুপের ১০ থেকে ১৫ জন। একপর্যায়ে একটি বাসার সামনে পড়ে যান তিনি। তারপর চারদিক ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে কোপানো হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ইমনের বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একপর্যায়ে ইমনকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত ১০ থেকে ১২ জনকে চিহ্নিত করেছে তারা। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনার দিন সকালেই রায়েরবাজার আসেন ইমন
পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান–সংলগ্ন এলাকায় অপরাধ কার্যক্রম চালালেও ইমন এ এলাকায় থাকতেন না। মাঝেমধ্যে সেখানে আসতেন। অপরাধ করে আবার ওই এলাকার বাইরে চলে যেতেন। রোববার সকালে সাভার থেকে রায়েরবাজার আসেন ইমন। এলাকায় আধিপত্য জানান দিতেই তিনি আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান। প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা আরমান, শাহরুখও রায়েরবাজারের বাইরে থাকেন।
পুলিশ বলছে, নিহত ইমন হোসেনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ ১৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায়ই দুটি হত্যা মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের পরে একটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্ত হন তিনি। অন্যদিকে আরমান ও শাহরুখের নামেও এসব থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান প্রথম আলোকে বলেন, ইমন হোসেন মোহাম্মদপুরের বাইরে থাকতেন। মাঝেমধ্যে এলাকায় আসতেন। অপরাধ করে আবার গা ঢাকা দিতেন। পুলিশ অনেক দিন ধরেই তাঁকে খুঁজছিল। রোববার সকালে তিনি এলাকায় এলে মোহাম্মদপুরের বাইরে এক দফা মারামারিতে জড়ান। সেই ঘটনার রেশ ধরেই বিকেলে খুন হন তিনি।
আতঙ্কে স্থানীয়রা
গতকাল দুপুরে রায়েরবাজার ১ নম্বর গলির ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ইমনকে হত্যার স্থানটি ইটের টুকরা ও কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। পাশের বাড়ির দেয়ালে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে। আশপাশ দিয়ে পথচারীরা চলাচল করছে। আসা–যাওয়ার পথে কেউ কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে তা দেখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাঝেমধ্যেই এ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের মধ্যে এমন মারামারির ঘটনা ঘটে। দা, চাপাতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আবার সন্ধ্যার পর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের আশপাশের এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই চুরি–ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তবে দিনের বেলা এভাবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁরা আতঙ্কিত। ভয়ে দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন তাঁরা।
সক্রিয় অন্তত ১০টি বাহিনী
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় এলাকায় একাধিক গ্যাং গড়ে উঠেছে। এরা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বেশির ভাগই তরুণ, যাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালান। এক গ্রুপের কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে কিছুদিন গা ঢাকা দেন। পরে ভিন্ন নামে আবার সক্রিয় হন।
পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুরে ৮–১০টি বাহিনী এখন সক্রিয় রয়েছে। এগুলো হলো গাংচিল, কবজি কাটা আনোয়ার, এলেক্স ইমন, আরমান-শাহরুখ, লও ঠেলা, লাড়া দে, লাল বাহিনী, বিরিয়ানি সুমন গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, দে ধাক্কা নামে পরিচিত। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ৮-১০টি কিশোর বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। যখন যে গ্রুপের সদস্যরা আইনের আওতায় আসেন, সেই গ্রুপের কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে যায়। পরে নতুন নামে আরেকটি গ্রুপ মাথাচাড়া দেয়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা মোহাম্মদপুর-আদাবরের গ্যাং কালচারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।