মোবাইল টাওয়ারে বেড়েছে চোরের হানা, বিপাকে অপারেটররা

দেশের চার মোবাইল অপারেটরের টাওয়ার ও নেটওয়ার্ক স্থাপনা থেকে গত ২০ মাসে প্রায় ১৬ হাজার মিটার পাওয়ার কেবল এবং ২ হাজারের বেশি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। একই সঙ্গে টাওয়ারে থাকা রিমোট রেডিও ইউনিট (আরআরইউ) ও বেস ট্রান্সসিভার স্টেশনের (বিটিএস) কার্ডও চুরি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চুরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটকের কেবল ও ব্যাটারি।

মোবাইল অপারেটররা বলছে, যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে যাওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটছে। এতে গ্রাহকেরা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

মোবাইল অপারেটরদের একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রাম এলাকায় টাওয়ার থেকে সরঞ্জাম চুরি হওয়ার পর তারা অনুসন্ধান করে দেখেছে, এখান থেকে খুলে নেওয়া ব্যাটারি ভ্যান ও রিকশায় ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে। এটা থামানো না গেলে বড় ধরনের বিপদে পড়তে হবে।

চুরি ঠেকাতে অপারেটররা নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। অ্যামটব বলছে, তারা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য বলছে, সারা দেশে মোবাইল অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানিগুলোর যৌথ উদ্যোগে ৪৫ হাজারের বেশি নেটওয়ার্ক টাওয়ার সচল রয়েছে। টাওয়ারগুলোতে বসানো থাকে নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। এত দিন এসব টাওয়ার থেকে ব্যাটারি ও পাওয়ার কেবল চুরির ঘটনা বেশি শোনা যেত। তবে এখন নেটওয়ার্কের সক্রিয় যন্ত্রাংশেও চোরেরা হাত দিচ্ছে।

ঢাকার লালবাগ, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, সাভার এবং পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা বেশি ঘটছে।

মোবাইল টেলিকম অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই ৪ অপারেটরের ৭ হাজার ৯৬৪ মিটার পাওয়ার কেবল, ১৯৪টি আরআরইউ, ১৭০টি বিটিএস কার্ড ও ৭৫৬টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে।

আর গত ২০ মাসে মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার ও স্থাপনা থেকে প্রায় ১৬ হাজার মিটার পাওয়ার কেবল, ২ হাজারের বেশি ব্যাটারি এবং ৫০০টির বেশি আরআরইউ চুরি হয়েছে। কিছু জায়গায় বিটিএস থেকে কার্ডও খুলে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকার পাশের একটি জেলায় মোবাইল টাওয়ার থেকে যন্ত্রপাতি চুরি করার সময় ধাওয়া খেয়ে পালায় চোরেরা। এ সময় টাওয়ার থেকে খুলে নেওয়া আরআরইউ ও পাওয়ার কেবল ফেলে যায় তারা

অ্যামটব মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় মোবাইল বিটিএস থেকে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এসব চুরি অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে পাওয়ার কেবল, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে। এতে গ্রাহক ও অপারেটর—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, এসব যন্ত্রপাতি সহজে স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি বসানো বা মেরামত করতে অনেক সময় ও অর্থ লাগে। এতে নেটওয়ার্ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। গ্রাহকেরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। আবার অপারেটরদের আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অ্যামটব বলছে, চুরি ঠেকাতে তারা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

চুরির প্রতিকার পেতে ১৬ সেপ্টেম্বর বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে অ্যামটব। চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা ও এর আশপাশের বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, লালবাগ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার ও গাজীপুরে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। সংগঠনটি বলছে, গত আট মাসে এসব ঘটনা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

চুরি বেশি টেলিটকে

অ্যামটবের দেওয়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হিসাব বলছে, পাওয়ার কেবল চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিটক। এই সময়ে টেলিটকের ৬ হাজার ৭৪৯ মিটার পাওয়ার কেবল চুরি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে চুরি হয়েছিল ৭ হাজার ৪৪২ মিটার। অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই চুরি হয়েছে গত বছরের মোট চুরির কাছাকাছি পরিমাণ কেবল।

এ ঘটনাগুলো আগে চট্টগ্রামে পাহাড়ে বেশি হতো। বর্তমানে অন্যান্য এলাকাতেও সেটি দেখা যাচ্ছে।
মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী, চেয়ারম্যান, বিটিআরসি

গ্রামীণফোনের ৫০৭ মিটার, রবির ৪১৭ মিটার এবং বাংলালিংকের ২৯১ মিটার পাওয়ার কেবল চুরি হয়েছে চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে। ৪ অপারেটর মিলিয়ে এ সময়ে ৭ হাজার ৯৬৪ মিটার পাওয়ার কেবল চুরি হয়েছে।

টাওয়ারের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারিও ব্যাপকভাবে চুরি হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে টেলিটকের ৪৫২টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। রবির ২৫৩টি, গ্রামীণফোনের ২৭টি এবং বাংলালিংকের ২৪টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। ৪ অপারেটর মিলে চুরি হয়েছে ৭৫৬টি ব্যাটারি।

চুরির প্রভাব গ্রাহকের ওপরও

অ্যামটবের চিঠিতে বলা হয়েছে, যন্ত্রংশ চুরির কারণে স্থানীয় নেটওয়ার্কে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে হাজারো গ্রাহক জরুরি কল করা, ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়তে পারেন। প্রতিটি ঘণ্টা নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় অপারেটরদেরও রাজস্ব ক্ষতি হয়।

বিশেষ করে টাওয়ারের ব্যাটারি চুরি হলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় ব্যাকআপ না থাকায় টাওয়ার অচল হয়ে যেতে পারে। আবার আরআরইউ বা বিটিএস কার্ডের মতো সক্রিয় যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হলে সরাসরি কল, ইন্টারনেটসহ নেটওয়ার্ক সেবা ব্যাহত হতে পারে।

এসব যন্ত্রপাতি সহজে স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি বসানো বা মেরামত করতে অনেক সময় ও অর্থ লাগে। এতে নেটওয়ার্ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। গ্রাহকেরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। আবার অপারেটরদের আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার, মহাসচিব, অ্যামটব

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ বলেন, দেশে ব্যাটারি, রেডিও ও ট্রান্সমিশন সরঞ্জামসহ গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি চুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জরুরি ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো সুরক্ষায় ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট ও রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এখন দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনাগুলো আগে চট্টগ্রামে পাহাড়ে বেশি হতো। বর্তমানে অন্যান্য এলাকাতেও সেটি দেখা যাচ্ছে। চুরি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিটিআরসি কাজ করছে।