রফিকুল ইসলাম সবুজের স্বীকরোক্তির পর একটি মাছের খামারের পুকুরে একটি ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ব্যবসায়ী হেকমত আলীর লাশ
রফিকুল ইসলাম সবুজের স্বীকরোক্তির পর একটি মাছের খামারের পুকুরে একটি ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ব্যবসায়ী হেকমত আলীর লাশ

সিমেন্টে ঢালাই করা ড্রামে চাপা ছিল হত্যার রহস্য

নারায়ণগঞ্জের হেকমত আলী, তিন মাস ধরে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তাঁর। এই নিখোঁজ রহস্যে সন্দেহ করা হচ্ছিল হেকমতের দূরসম্পর্কের ভাগনে রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজকে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে দুই দফা রিমান্ডেও নেয়। কিন্তু কিছু জানতে পারেনি।

দুই মাসের বেশি সময় পর এ ঘটনার তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তকারীদের সামনে আসে একটি প্রশ্ন—নিখোঁজ হওয়ার রাতেই হেকমতের দূরসম্পর্কের ভাগনে রফিকুল কেন একজন নছিমনচালকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেছিলেন?

নছিমনচালককে খুঁজে বের করার পর প্রথমবারের মতো সামনে আসে একটি ড্রামের গল্প। ওই চালক জানান, ভোরে রফিকুলের বাড়িতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, একটি ভারী ড্রাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন রফিকুল, তাঁর দুই ভাই ও বাবা। ড্রামটি নছিমনে তুলে কিছু দূর নেওয়ার পর তাঁকে বিদায় করে দেওয়া হয়।

এরপর সেই ড্রামের রহস্য নিয়েই শুরু হয় নতুন অনুসন্ধান।

নিহত হেকমত আলী

নছিমনচালকের কাছ থেকে ড্রামের তথ্য পাওয়ার পর রফিকুলকে আবার রিমান্ডে নেয় পিবিআই। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি দেন বলে জানান পিবিআই কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, হেকমতকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ একটি ড্রামের ভেতরে ভরে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়েছিল। পরে ড্রামটি একটি মাছের খামারের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

রফিকুলের দেখানো জায়গায় ডুবুরি নামানো হলে পুকুরের তলা থেকে উদ্ধার করা হয় ড্রামটি। ড্রামটি কেটে খুলতেই বেরিয়ে আসে হেকমতের মরদেহ। সেই সঙ্গে উদ্‌ঘাটিত হয় নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পরিকল্পিত হত্যা ও লাশ গুমের কাহিনি।

২০২০ সালের ৪ এপ্রিল রূপগঞ্জের কালাদীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন হেকমত। তাঁকে খুঁজে না পেয়ে ১০ দিন পর ১৪ এপ্রিল রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন তাঁর স্ত্রী রোকসানা বেগম। থানা–পুলিশ ব্যর্থ হলে ওই বছরের ১৫ জুন মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। এরপর আদালতের মাধ্যমে ৩০ জুন দুই দিনের জন্য রফিকুলকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তারপর ২ জুলাই হেকমতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

‘ক্লুলেস’ ঘটনার রহস্যভেদ নিয়ে পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধীরা মনে করেছিলেন, মরদেহ গুম করে হত্যার সব চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু মুঠোফোনের তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে মরদেহ উদ্ধার থেকে শুরু করে হত্যার পুরো পরিকল্পনাই উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে।

হত্যা ও গুম

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, হেকমতের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও পারিবারিক বিরোধ ছিল রফিকুলের। তার জের ধরে রফিকুল কুশাবো এলাকার নিজের বাড়িতে হেকমতকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়।

হেকমত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকায় মোটর পার্টসের ব্যবসা করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ছিলেন দূরসম্পর্কের ভাগনে রফিকুল ইসলাম।

২০২০ সালের ৪ এপ্রিল নিখোঁজ হন নারায়ণগঞ্জের মোটর পার্টসের ব্যবসায়ী হেকমত আলী। ১০ দিন পর ১৪ এপ্রিল রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন তাঁর স্ত্রী রোকসানা বেগম। থানা–পুলিশ ব্যর্থ হলে ওই বছরের ১৫ জুন মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। এরপর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার রফিকুল ইসলাম সবুজকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যে ২ জুলাই মাছের খামারের পুকুরে ডুবে থাকা একটি ড্রাম থেকে হেকমতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তাঁদের বিরোধ নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, হেকমতের ব্যবসায় একসময় অর্থও বিনিয়োগ করেন রফিকুল। কিন্তু লাভের অংশ, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিয়ের কয়েকটি প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার জন্যও হেকমতকে দায়ী করতেন রফিকুল।

এই বিরোধের জের ধরেই হেকমতকে হত্যার পরিকল্পনা রফিকুল করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরে এই পরিকল্পনায় যুক্ত হন তাঁর দুই ভাই মাহফুজুর রহমান ও মামুন এবং তাঁদের বাবা ইয়াকুব হোসেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল রাতে হেকমতের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন রফিকুল। বিয়ের জন্য পাত্রী দেখানোর কথা বলে পরদিন তাঁদের বাড়িতে আসতে বলেন। পরদিন (৪ এপ্রিল) সকালে হেকমত যান রফিকুলদের বাড়িতে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর তাঁকে একটি কক্ষে বিশ্রাম নিতে বলা হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, একপর্যায়ে হেকমত ঘুমিয়ে পড়লে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাঁকে। এরপর মরদেহ গুম করতে একটি খালি ড্রামের ভেতরে ঢুকিয়ে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। নির্মাণকাজের জন্য বাড়িতে সিমেন্ট মজুত ছিল।

৪ এপ্রিল মধ্যরাতে রফিকুল ইসলাম নছিমনচালক মো. শান্ত মিয়াকে ফোন করেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন। নছিমনচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ড্রাম দোকানে নিতে ৫ এপ্রিল ভোরে তাঁকে ডাকা হয়েছিল। তিনি সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে রফিকুলদের বাড়িতে পৌঁছে যান। গিয়ে দেখেন, একটি বড় ড্রাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন রফিকুল, তাঁর দুই ভাই এবং তাঁদের বাবা। চারজন মিলে ড্রামটি নছিমনে তোলেন।

হেকমত আলীর ব্যবসায় একসময় অর্থ বিনিয়োগ করেন রফিকুল ইসলাম সবুজ। লাভের অংশ, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে।

এরপর রফিকুল নছিমনে উঠে শান্ত মিয়ার সঙ্গে রওনা দেন। কিছু দূর যাওয়ার পর রূপগঞ্জের কুশাবো-লিচু ফ্যাক্টরির সামনে একটি মাছের ঘেরের কাছে ড্রামটি নামানো হয়। ড্রাম নামানোর পর শান্ত মিয়াকে ভাড়া দিয়ে চলে যেতে বলা হয়।

শান্ত মিয়া জানান, ড্রামটির ভেতরে কী আছে, তিনি জানতেন না।

দণ্ডিত রফিকুল ইসলাম সবুজ

মরদেহ উদ্ধার

শান্ত মিয়ার কাছে থেকে তথ্য পাওয়ার পর রফিকুলকে আবার রিমান্ডে নেয় পিবিআই। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২০ সালের ২ জুলাই পিবিআইয়ের একটি দল কুশাবো এলাকায় ডুবুরি নিয়ে যায়। মাছের খামারের পানিতে শুরু হয় অনুসন্ধান। কিছু সময় খোঁজাখুঁজির পর পানির নিচে একটি ভারী ড্রামের সন্ধান পান ডুবুরিরা। পরে সেটি টেনে ওপরে তোলা হয়। উপস্থিত তদন্তকারীরা দেখতে পান, ড্রামটির মুখ শক্তভাবে বন্ধ করা। বাইরের অংশে সিমেন্টের আস্তরণও দেখা যাচ্ছিল।

ড্রামটি উদ্ধারের পর সেটি কেটে খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ধাতব আবরণ কেটে মুখ খোলার পর পাওয়া যায় হেকমতের মরদেহ। প্রায় তিন মাস ধরে নিখোঁজ থাকা এই ব্যবসায়ীর খোঁজ মেলে সেদিনই। একই সঙ্গে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

অপরাধীরা মনে করেছিলেন, মরদেহ গুম করে হত্যার সব চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু মুঠোফোনের তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে মরদেহ উদ্ধার থেকে শুরু করে হত্যার পুরো পরিকল্পনাই উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে।
মোস্তফা কামাল, পিবিআইপ্রধান

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মরদেহ যাতে ভেসে না ওঠে এবং দীর্ঘদিন কারও নজরে না আসে, সে জন্যই ড্রামের ভেতরে রেখে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়েছিল।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, হেকমত হত্যার মামলায় গত ফেব্রুয়ারিতে রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে রফিকুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁর ভাই মাহফুজুর রহমানকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।