
‘আমার বাবু কোথায়? তোমরা আমার বাবারে এনে দাও। আমার বাবা সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমারে কইছে একটু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। তার ক্লাস আছে। এখন আমার বাবা কই? তোমরা আমার বাবারে আনি দাও।’ ট্রাকচাপায় নিহত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ছাত্র অজয় মজুমদারের মা পাপিয়া রানী মজুমদার শহরের গুডহিল হাসপাতালের প্রবেশপথের পাশে বসে এভাবে বিলাপ করছিলেন।
মায়ের বিলাপ করে কান্না দেখে আশপাশে থাকা অজয় মজুমদারের সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। মায়ের পাশে বসা অজয়ের ছোট বোন প্রীতি লতা মজুমদার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুতে এতটাই ভেঙে পড়েছেন, তিনি যেন কাঁদতেই পারছিলেন না। খানিক পরপর বলে উঠছেন, ‘আমার দাদা কই?’
বিলাপ করতে করতে পাপিয়া মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী বাদল চন্দ্র মজুমদার আবুধাবিপ্রবাসী। সন্তানদের নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন। এই ছেলেকে অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করিয়ে এই পর্যন্ত এনেছেন। অজয় খাসেরহাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সৈকত সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ছেলে জেলা শহরে মেসে থেকে পড়ালেখা করতেন। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
মায়ের পাশে বসা অজয়ের ছোট বোন প্রীতি লতা মজুমদার যেন কাঁদতেই পারছিলেন না। খানিক পরপর বলে উঠছেন, ‘আমার দাদা কই?’
পাপিয়া মজুমদার বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে ছেলেটা খানিক অসুস্থ ছিল। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাইয়ে কিছুটা সুস্থ করেছি। এরই মধ্যে আজ সকালে বলল, মা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব, ক্লাস আছে। দুপুরে অজয়ের এক সহপাঠী ফোন করে দুর্ঘটনার কথাটা জানায়। সঙ্গে সঙ্গে শহরে হাসপাতালে এসে দেখি, ছেলে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম ব্যাচের ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অজয় মজুমদারকে (২২) একটি ট্রাক চাপা দেয়। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর প্রথম আলোকে বলেন, মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মেধাবী ছাত্র অজয় মজুমদারের মৃত্যুতে তাঁরা গভীরভাবে শোকাহত। এই মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় একজন মেধাবী মুখকে হারাল। পাশাপাশি তাঁর পরিবারের স্বপ্নের অপমৃত্যু হলো। এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অজয়ের পরিবারকে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক সহযোগিতা করবে। সন্ধ্যায় তাঁর লাশের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি দল তাঁর গ্রামের বাড়িতে গেছে। সেখানে তাঁর মরদেহ সৎকার করা হবে।
উপাচার্য মো. দিদার-উল-আলম বলেন, মেধাবী এ শিক্ষার্থীর অকালপ্রয়াণ খুবই কষ্ট ও বেদনার। তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য এ শোক সহ্য করা কঠিন। দুর্ঘটনায় একটি সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটল। তিনি নোবিপ্রবি পরিবারের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন ও তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেন।