বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু আম উঠতে শুরু করেছে হাটে-বাজারে। নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে ফলের দোকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন জাতের আম। আজ শুক্রবার বিকেলে
বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু আম উঠতে শুরু করেছে হাটে-বাজারে। নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে ফলের দোকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন জাতের আম। আজ শুক্রবার বিকেলে

নওগাঁয় পাইকারি ও খুচরা বাজারে আমের দামে বিস্তর ফারাক

দেশে আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা নওগাঁয় আমের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার সাপাহার। গত বুধবার সেখানে আমচাষিরা প্রতি কেজি গোপালভোগ আম বিক্রি করেন ২৬ থেকে ৩০ টাকায়। সেখান থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড় ও পৌর বাজারে ফলের দোকানগুলোতে ওই দিন ক্রেতারা প্রতি কেজি আম কিনেছেন ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। অর্থাৎ নওগাঁতেই পাইকারি ও খুচরা বাজারে আমের দামের ফারাক প্রায় দ্বিগুণ।

শুধু গোপালভোগই নয়, বাজারে ওঠা হিমসাগর (ক্ষীরশাপাতি) ও নাগফজলি আম এক হাত বদলের পর নওগাঁর খুচরা বাজারে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের এই তারতম্যের কারণে একদিকে চাষিরা যেমন ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের আমের নাগাল পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আমের আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত আম পরিবহনে খরচ পড়ে প্রতি কেজিতে বড়জোর সাত টাকা। অথচ আম উৎপাদনে দেশের শীর্ষ জেলা হয়েও খোদ নওগাঁতেই পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আমের দামে আকাশ-পাতাল হেরফের। আর রাজধানী ঢাকার বাজারে সেই আম যখন বিক্রি হচ্ছে, ক্রেতারা ন্যায্য দামে আম কেনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নওগাঁর সাপাহার উপজেলা সদরের প্রধান সড়কের দুই পাশে ভ্যানে করে নিয়ে আসা আম বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন চাষিরা। গত বুধবার দুপুরে

সাপাহার আমের হাটে বুধবার প্রতি মণ গোপালভোগ গুণগত মান বিচারে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর হিমসাগর প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। প্রতি মণ নাগফজলি বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। আমের হাটে ৪৫ কেজিতে ১ মণ ধরা হয়। এ হিসাবে পাইকারিতে প্রতি কেজি গোপালভোগ ২৬ থেকে ৩০ টাকা, হিমসাগর ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা এবং নাগফজলি প্রতি কেজিতে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে।

একই দিন নওগাঁর ব্রিজের মোড় ফল বাজার, দয়ালের মোড় ও পৌর বাজারের খুচরা ফলের দোকানে দেখা যায়, প্রতি কেজি গোপালভোগ ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়, হিমসাগর ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় ও নাগফজলি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সাপাহার আমের হাটে আম বিক্রি করতে আসা নিশ্চিতপুর গ্রামের আমচাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে ৮ মণ গোপালভোগ বিক্রি করলাম। অথচ এই আমই নওগাঁ কিংবা ঢাকার বাজারে যান, আড়াই হাজার টাকার নিচে পাবেন না। দামে ও ওজনে সব দিক থেকেই আমরা চাষিরা ঠকছি। এখানকার আড়তদার সমিতির নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা ৪৫ কেজিতে মণ ধরে আম কিনবেন। আমচাষিদের মধ্যে কোনো ঐক্য না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁদের হিসাবেই আমাদের আম বিক্রি করতে হচ্ছে।’

ওগাঁতেই পাইকারি ও খুচরা বাজারে আমের দামের ফারাক প্রায় দ্বিগুণ। নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে আজ শুক্রবার বিকেলে

ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুণ গ্রামের আমচাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার আমের ফলন ভালো হয়েছে। তবে দাম কিছুটা কম। গোপালভোগ ও হিমসাগর এবার প্রতি মণ ১০০ থেকে ২০০ টাকার কমে বিক্রি হচ্ছে। আবার ৪৫ কেজিতে মণ ধরে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে চাষিরা ওই দিক দিয়েও ঠকছেন। আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে চাষিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

জানতে চাইলে সাপাহার আম আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা বলেন, ‘আড়তদারেরা কোনো সিন্ডিকেট করেননি। আমে ৪৫ কেজিতে মণ, এটা অনেক আগে থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে চালু রয়েছে। এটা আমরা এবার প্রথম এখানে চালু করলাম। আর আম বিক্রি করে আড়তদারেরা আহামরি লাভ করেন না। বড়জোর প্রতি মণ আম বিক্রি করে আমাদের ২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে।’

সমাজতান্ত্রিক খেতমজুর কৃষক ফ্রন্টের নওগাঁ শাখার সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন বলেন, ফল ও সবজি হচ্ছে দ্রুত পচনশীল দ্রব্য। সবজির মতো ফলের ক্ষেত্রেও পাইকারি বাজার ও খুচরা বাজারেও দামের তারতম্য হবে। তবে তা দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ তারতম্য হওয়ার কথা নয়। আম ক্রেইটে (বাক্স) করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি ক্রেইটের দাম ১১০ টাকা। এ ছাড়া গাড়িভাড়া রয়েছে। সব মিলে আম পরিবহনে সর্বোচ্চ সাত টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে থাকে। পরিবহন খরচ ছাড়াও মাঝখানে আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কেজিতে পাঁচ-ছয় টাকা লাভ করলেও আমের দাম দ্বিগুণ হওয়ার কথা নয়। কেজিতে পাঁচ থেকে ছয় টাকা লাভ অনেক। পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে কীভাবে দামের এত তারতম্য হয়? ভোক্তা ও কৃষকদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে এ ব্যাপারে প্রশাসনের বাজারে নজরদারি বাড়ানো উচিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নওগাঁয় এ বছর ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১৪ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ হিসাবে জেলায় আম উৎপাদনের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আম বাণিজ্য হবে বলে ধারণা করছে কৃষি বিভাগ।