
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের হোসেনডাঙ্গা গ্রাম, আজ শুক্রবার বেলা ১১টা। রাস্তার পাশে এক হাতে কবুতরের বাচ্চা আর এক হাতে হাঁসুয়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জাহানারা বেগম (৫০)। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড়িতে স্বামী অসুস্থ। কবুতর জবাই করে রান্না করবেন। নারীদের দিয়ে জবাই করা চলে না। কিন্তু জবাই করার জন্য কোনো পুরুষ মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন না। গ্রামে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। সবাই পুলিশের ভয়ে পালিয়ে আছেন।
জাহানারা বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গ্রামে স্থানীয়দের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে কয়েকজন পুলিশ আহত হয়েছেন। পরে আরও পুলিশ এসে বাড়ি বাড়ি ঢুকে বেদম লাঠিপেটা করেছে। চালিয়েছে ভাঙচুরও। ধরে নিয়ে গেছে অনেককে। তাই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে পুরুষশূন্য অবস্থা চলছে এ গ্রামে। পাশের গ্রাম বড়পুকুরিয়াতেও একই অবস্থা।
এ দুই গ্রামের দুই জামে মসজিদে আজ জুমার নামাজে উপস্থিত ছিল কেবল গ্রামের বৃদ্ধ, শিশু ও এলাকার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা, যা ১০ ভাগের ১ ভাগের কম।
ঝিলিম ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এ গ্রাম দুটি। এবার হোসেনডাঙ্গা গ্রামের দুজন ও বড়পুকুরিয়া গ্রামের একজন ছিল ইউপি সদস্য প্রার্থী। হোসেনডাঙ্গা গ্রামের হোসেনডাঙ্গা হাজী তাবারক আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এ ওয়ার্ডের একমাত্র ভোটকেন্দ্র। এ কেন্দ্রে ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে গতকাল (ভোটের পরদিন) বিক্ষোভ হয়। নতুন করে ভোট গ্রহণের দাবিতে পরাজিত প্রার্থী হোসেনডাঙ্গা গ্রামের মনিরুল ইসলাম ও বড়পুকুরিয়া গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের আহ্বানে এই দুই গ্রামের তাঁদের পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ সমর্থক জড়ো হন ভোটকেন্দ্রের মাঠে। ওই সময় তাঁরা সাংবাদিকদের বলেন, ভোট গণনায় কারচুপি করে পাস করানো হয়েছে হোসেনডাঙ্গা গ্রামের শরিয়ত আলীকে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের হোসেনডাঙ্গা গ্রামে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে পুরুষশূন্য অবস্থা চলছে। পাশের গ্রাম বড়পুকুরিয়াতেও একই অবস্থা।
ওই সমাবেশ চলাকালে পুলিশ এসে তাঁদের ওপর বেধড়ক লাঠিপেটা শুরু করে। মারধর করা হয় নারীদেরও। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন মানুষেরা। আহত হন তিন পুলিশ সদস্যসহ ছয়জন। পরে সদর থেকে আরও পুলিশ এসে হোসেনডাঙ্গা গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঢুকে পুরুষ সদস্যদের খুঁজতে থাকে। কয়েকটি বাড়িতে পুরুষ সদস্যদের পেয়ে তাঁদের মারধর করে ও থানায় ধরে নিয়ে যায়।
হোসেনডাঙ্গা গ্রামের নারীরা অভিযোগ করেন, ৭৪ বছর বয়সী আবু বাক্কার, অসুস্থ মো. মোত্তালেব (৬০), মো. বাবু (৩৫), মফিজুল ইসলাম (৩৮), মো. মইদুল (২৩), মো. নয়ন (২৮) মো. তৈমুর (৪০), মো. সাকিল (২২), মিজানুর রহমানকে (২৫) বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। এ সময় পুলিশ এ গ্রামের সদস্য প্রার্থী ও বর্তমান ইউপি সদস্য মনিরুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালায়।
প্রায় একই সময় বড়পুকুরিয়া গ্রামেও অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় পুলিশ সদস্যরা আবদুল কুদ্দসের বাড়িতে ভাঙচুর চালান। আবদুল কুদ্দুসের কর্মী মো. সোহেল ও বাদশার বাড়িতে ঢুকেও ভাঙচুর চালান। এ সময় পুলিশ মো. রাসেল নামে (১৫) একজন কিশোর অটোচালককে মারধর করে ধরে নিয়ে যায়।
আবদুল কুদ্দসের স্ত্রী সুরভি বেগম প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ বাড়িতে ঢুকে টিভি, ফ্রিজ, ড্রেসিং টেবিল, শোকেস, চেয়ার, টেবিল, ডেকচি, রাইস কুকারসহ অন্যান্য আসবাব ভাঙচুর করে। পুলিশের কয়েকজন সদস্য তাঁর গলা থেকে এক ভরি ওজনের একটি সোনার চেইন, হাতের বালা ও হাত থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া বাড়িতে থাকা ৬২ হাজার টাকাও ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁরা।
আবদুল কুদ্দুসের পোলিং এজেন্ট ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন আলী (৩০) প্রথম আলোকে বলেন, ভোটের দিন গণনা শেষে তাঁদের জানানো হয়, তালা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল কুদ্দুস বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু এর অল্পক্ষণ পরই বলা হয়, আপেল প্রতীকের ১০০ ভোট ভুল করে তালা প্রতীকের হিসাবে ঢুকে গেছে। এই ওয়ার্ডে সদস্য পদে পাস করেছেন টিউবওয়েল প্রতীকের প্রার্থী শরিয়ত আলী।
সুমন আলী বলেন, তাঁরা আবার ভোট গণনার দাবি জানান। কিন্তু তা নাকচ করে তাঁদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। তাঁদের ওপর লাঠিপেটা শুরু করে পুলিশ। পরদিন প্রতিবাদ সমাবেশে নারীদের লাঠিপেটা, দুই গ্রামে ঢুকে ভাঙচুর, বয়স্ক ও অসুস্থ পুরুষদের মারধর, নারীদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে পুলিশ। পুলিশের এমন আচরণ দেখে মনে হয়েছে, এরা কি ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পুলিশ?
গ্রামে ঢুকে ভাঙচুর, মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ বানোয়াট-ভিত্তিহীন দাবি করে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফ্ফর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে হোসেনডাঙ্গা হাজী তাবারক আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হন পরাজিত দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর লোকজন। এ সময় জয়ী প্রার্থীর লোকজনের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলায় তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ব্যাপারে উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান আলী বাদী হয়ে ১৩৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এ মামলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।