প্রতারণা করে জামিন, সেই ছোট ভাইকে গ্রেপ্তার করল র‍্যাব

কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে গ্রেপ্তার রফিকুল ইসলাম
ছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজারে মানব পাচারের একটি মামলায় উচ্চ আদালতে বড় ভাই আলাউদ্দিন সেজে আগাম জামিন নিয়ে লাপাত্তা হওয়া ছোট ভাই রফিকুল ইসলামকেও গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। আজ বুধবার ভোরে মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর এলাকার একটি আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় র‍্যাবের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রফিকুলকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানান র‍্যাব-১৫-এর উপ–অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর মেহেদী ইসলাম। রফিকুল রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের পশ্চিম সমুদ্রপাড়া এলাকার মৃত মো. ইলিয়াসের ছেলে।

সংবাদ সম্মেলনে মঞ্জুর মেহেদী ইসলাম বলেন, উচ্চ আদালত থেকে প্রতারণার মাধ্যমে আগাম জামিন নিয়ে লাপাত্তা হয় রফিকুল। এরপর সে মহেশখালীর একটি পাহাড়ি আস্তানায় আত্মগোপন করেছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‍্যাব পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে রফিকুলকে গ্রেপ্তার করে। রফিকুলকে রামু থানায় হস্তান্তর করা হবে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতে আলাউদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার উজানটিয়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ারা জারি করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জি এম জাহিদ হোসেন বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চে আলাউদ্দিনের (২২) বদলে তাঁর ছোট ভাই রফিকুলকে (১২) দাঁড় করানো হয়। আদালত ১২ বছর বয়সী শিশু রফিকুলকে আলাউদ্দিন মনে করে আট সপ্তাহের আগাম জামিন দেন। এ নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়।

ওই সংবাদের ছবিতে দেখা গেছে, আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীর সঙ্গে আলাউদ্দিনের জায়গায় রফিকুল ও তার মা রাজিয়া বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। ২২ বছরের তরুণ আলাউদ্দিনের জায়গায় ১২ বছরের শিশু রফিকুলের ছবি দেখে রামুর বাসিন্দারা অবাক হন। এরপর বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তৎপর হলে আলাউদ্দিন উধাও হয়ে যান। সঙ্গে রফিকুল, মা রাজিয়া বেগমসহ পরিবারের সবাই আত্মগোপন করেন। ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে ‘ছোট ভাইকে দেখিয়ে বড় ভাইয়ের জামিন, লাপাত্তা দুজনই’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ারুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রামুর একটি হত্যাচেষ্টা মামলার পলাতক আসামি হিসেবে গত ২৯ মার্চ রাতে পুলিশ উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের শাহআহমদের পাড়ার একটি আস্তানা থেকে আলাউদ্দিন, তাঁর মা রাজিয়া বেগম ও বড় ভাই মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তাঁরা কক্সবাজার কারাগারে বন্দী।

মানব পাচার মামলার বাদী নুরুল ইসলাম বলেন, আলাউদ্দিন আগে ধরা পড়েছেন, এখন রফিকুলও ধরা পড়ায় প্রকৃত আলাউদ্দিনকে আদালতে ফয়সালা করা সম্ভব হবে। কারণ, এত দিন মা রাজিয়া বেগম আদালতে ২২ বছর বয়সী ছেলে আলাউদ্দিনকে ১৫ বছর বয়সী ছেলে রফিকুল দাবি করে আসছিলেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৪ সালের ২০ জুন আলাউদ্দিনসহ অন্য আসামিরা মালয়েশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মামলার বাদী নুরুল ইসলামকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে কক্সবাজারের দরিয়ানগর উপকূলে নিয়ে যান। সেখান থেকে নুরুল ইসলাম ও একই এলাকার হেলালউদ্দিনকে ট্রলারের মাধ্যমে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর জাহাজটি থাইল্যান্ড উপকূলে তাঁদের নামিয়ে দেয়। সেখানকার দালালেরা তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন। এরপর ওই দুজনকে মালয়েশিয়ায় দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের জুন মাসে মালয়েশিয়া পুলিশ অবৈধ অভিবাসী হিসেবে নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এক বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে নুরুল ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশ সরকার। এরপর ২৯ অক্টোবর আলাউদ্দিনসহ ছয় আসামির বিরুদ্ধে মানব পাচার মামলা করেন নুরুল ইসলাম।

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর কক্সবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আদিবুল ইসলাম আলাউদ্দিনের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, পত্রপত্রিকায় আলাউদ্দিনের যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি আলাউদ্দিনের ছোট ভাই রফিকুল ইসলামের।