
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় রেখা খাতুন (৩৬) নামের এক নারীকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ঝিনাইদহ অতিরিক্ত দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মো. শওকত হোসাইন। পাশাপাশি তাঁকে এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে দণ্ডিত রেখা খাতুনকে আপাতত কারাগারে যেতে হচ্ছে না। আসামির পারিবারিক অবস্থা, স্বপ্রণোদিত দোষ স্বীকারসহ সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শর্ত সাপেক্ষে তাঁকে ঝিনাইদহ জেলা প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে দুই বছরের জন্য ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘স্বামী পরিত্যক্তা’ হিসেবে রেখা খাতুনকে সরকারের বিশেষ ভাতা প্রদানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই রায় শুনে খুশি রেখা খাতুন। তিনি বলেন, ‘অন্ধ বাবা, বৃদ্ধা মা আর তিন সন্তানের সংসার বাঁচাতে জীবনে প্রথম অপরাধ জগতে পা দিয়েছিলাম, যা ছিল আমার জন্য একট বড় ভুল। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি, আদালতে দোষ স্বীকার করেছি। আর কখনো অপরাধ করব না, সেটাও জানিয়েছি।’ রেখা বলেন, সবকিছু বিবেচনায় আদালত তাঁকে ভালো হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। তাঁর পরিবারটির টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার থানাপাড়ার ফরমান আলীর মেয়ে রেখা খাতুন। তিনি ২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর সকালে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর গ্রামের মাঝে পুলিশের একটি তল্লাশিচৌকিতে ৬০ বোতল ফেনসিডিলসহ আটক হন। পরে তাঁর নামে কোটচাঁদপুর থানায় মামলা হয়। সেই মামলার পুলিশ অভিযোগপত্র দেন। আসামি রেখা খাতুন ২ মাস ১২ দিন হাজতবাসের পর জামিনে মুক্তি পান। এর পর থেকে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছিলেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির বিচারকার্য চলাকালে গত ২২ মার্চ রেখা খাতুন স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতকে জানান, তাঁর বিরুদ্ধে অন্য আর কোনো মামলা নেই। তিনি বিবাহিতা, তবে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। তাঁর তিন সন্তান, যারা সবাই তাঁর ওপর নির্ভরশীল। তার কোনো জায়গাজমি নেই। এজাহারে লেখা ঘটনা সত্য, তিনি আসলেই ফেনসিডিল বহন করছিলেন। পেটের দায়ে তিনি এই অপরাধ করেছেন। এর জন্য ২ মাস ১২ দিন জেলও খেটেছেন। এ রকম অপরাধ তিনি আর কখনো করবেন না। তিনি সংশোধন হতে চান এবং পরিশ্রম করে সৎপথে জীবিকা নির্বাহ করতে চান। এমনকি এ মামলা চালানোর মতো টাকাও তাঁর কাছে নেই বলে জানান।
এমন অবস্থায় আসামিকে কারাগারে না দিয়ে ১৯৬০ সালের প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী জেলা প্রবেশন কর্মকর্তার অধীনে পাঠানো যায় কি না, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন আদালত। সমাজসেবা কর্মকর্তার প্রতিবেদন পেয়ে আদালত বৃহস্পতিবার উল্লিখিত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে নয়টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলোর কোনো একটি লঙ্ঘন করলে বা পুনরায় অপরাধে জড়ালে রায়ের ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করার জন্য তাঁকে কারাগারে যেতে হবে।
ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আখিনুর রহমান জানান, তদন্তে দেখা যায়, রেখা খাতুন সহজ–সরল মানুষ। তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি আর্থিকভাবে খুবই খারাপ অবস্থায় আছেন। শরীরে রয়েছে নানা রোগ। এ ছাড়া এটাই তাঁর প্রথম অপরাধ। তাঁরা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদন পেয়ে আদালত যে আদেশ দিয়েছেন, তা যুগান্তকারী আদেশ।
রেখা খাতুন বলেন, আদালত তাকে যে নির্দেশনা দিয়ে বাড়ি থাকার সুযোগ দিয়েছেন, তিনি সেগুলো মেনে চলবেন। আশা করছেন তিনি ভালো হয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারবেন।
রেখা খাতুনকে দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রচলিত কোনো আইন লঙ্ঘন করবেন না, আদালত তলব করলে অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন, প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকবেন এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলবেন, নিজেকে আইনমান্যকারী সৎ ও কর্মঠ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করবেন, এই সময়কালে তিনি মাদক সেবন বা বিক্রি করবেন না, তিনি রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত হবেন না। প্রতি ছয় মাসে প্রবেশন কর্মকর্তা আসামির সার্বিক পরিস্থিতির ওপর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।