‘যদি কেউ খাবার দেয় খাম, না হইলে উপাস’

ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন। দুই দিনে উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের হকের চরের নয়টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে
ছবি: প্রথম আলো

‘এখন হাতে কোনো কাজ নেই। বাড়িঘর নদীতে ভাঙায় নতুন চরে যাচ্ছি—যদি কেউ কোনো খাবার দেয় খাম, না হইলে উপাস।’

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের পেটে দ্বীপের মতো টিকে আছে হকের চর। নদের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন। দুই দিনে এখানকার নয়টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এমন একটি পরিবারের আমিনুল মিস্ত্রির স্ত্রী নাজমা বেগম কথাগুলো বলছিলেন।

একই এলাকার আলেমা খাতুন বলেন, ‘ঘর ভাঙছে খাই কেমনে। আনিস (শিশুসন্তান) চিড়া–মুড়ি খাইছে। কষ্টের শেষ নাই।’

জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কমেনি বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ। চর ও নদ–নদীর অববাহিকার নিচু এলাকাগুলোতে এখনো পানি জমে আছে। অনেকের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও সেগুলো বসবাসের উপযোগী হয়নি। দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। গ্রামীণ ও চরের সড়ক ভেঙে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে।
সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ বানভাসিদের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি। অনেক চরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার ও গো–খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩২৫টি স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে।

জেলার প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে জানিয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আবদুর রশিদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাত হাজার কৃষক। পুরো পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হবে।

হকের চরের আমিনুল মিস্ত্রি (৬০), আলহাজ মিস্ত্রি (৩৫) ঘরের চালসহ অন্যান্য আসবাব নৌকায় তুলে যাচ্ছিলেন গুজিমারীর চরে। মাঝনদীতে দেখা মেলে এই দুই পরিবারের সঙ্গে। তাঁদের বাবা রফিকুল মিস্ত্রী (৮০) বসেছেন নৌকার ছইয়ের ওপর। পরিবারের নারী ও শিশুরা ছিল ছইয়ের ভেতরে।

কয়েক দফায় মালামাল টানার জন্য পাঁচ হাজার টাকা নৌকাভাড়া দিতে হবে জানিয়ে রফিকুল মিস্ত্রি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ করে ব্রহ্মপুত্র নদের স্রোতে পাড় ভাঙা শুরু করে। দুই দিনে আমার দুই ছেলের বাড়িসহ নয়জনের বসতভিটা ভেঙে গেছে। এখন গুজিমারির চরের যাম।’ দুঃখ করে তিনি বলেন, ‘এই নিয়ে ছয়বার বাড়ি ভাঙল।’

হকের চরের ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব মাইদুল, মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ দফাদার, আম্বর আলী, আনোয়ার আলী ও মুকুল এখনো মাথা গোজার ঠাঁই পাননি। এমন দুর্যোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের দেখা নেই।

সাহেবের আলগা ইউনিয়নের দুর্গম চর বাগুয়া। চতুর্দিকে নদী, চরে নেই কোনো স্কুল বা হাটবাজার। এলাকার জুরান, মজিবর শেখ ও কুরফান দেওয়ানী মিলে তিন একর জমির ওপর গত বছরের অক্টোবর মাসে আনন্দ বাজার নামের একটি বাজার বসান। বছর না ঘুরতেই যে ভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে আনন্দ বাজারের মানুষের মনে আনন্দ নেই। এ বাজারে বিভিন্ন ধরনের ৩৫টি দোকানঘর ছিল। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভেঙে নদীতে গেছে ১৫টি। এলাকার গৃহস্থ আক্কাস আলী বলেন, নদীর ভাঙন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। চলতি বন্যা মৌসুমে আনন্দ বাজারসংলগ্ন চর বাগুয়ায় ৩৪টি পরিবার গৃহহীন হয়েছেG

জানতে চাইলে সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবু সায়েম বলেন, ‘গুজমারী চরে পাঁচটি পাড়া। এগুলো হলো গুজিমারী, হকের চর, কাজিয়ার চর, জোদ্দার পাড়া ও পূর্বপাড়া। এসব পাড়ায় প্রায় তিন হাজার মানুষের বাস হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসহায়তা দেওয়া যায়নি। চলতি বন্যায় এখানকার ১৫১টি পরিবার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে। তালিকা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) দিয়েছি। কিন্তু কোনো ত্রাণ দেন নাই।’

পাহাড়ি ঢলের তোড়ে তলিয়ে যাওয়া একটা বাড়ি। হাতিয়া ইউনিয়নের বাবুর চরে

গতকাল শুক্রবার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে দেখা যায়, দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে বাবুর চর। এখানকার কৃষিশ্রমিক সাইফুল বলেন, ‘আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। মাঝেমধ্যে কাবু হয়ে যায়। ডাক্তার যে দেখাম, সেই উপায় নাই। বানের মধ্যে কাই (কেউ) আইসে নাই। চেয়ারম্যান–মেম্বার খোঁজ নেননি। বৃহস্পতিবার কয়েকজন ছাত্র এক কেজি চিড়া এবং এক পোয়া গুড় দিছে। সেই সব খায়া আছি।’

এ রকম অবস্থা বাবুর চরের শাহের আলী, ছক্কু মিয়া, সাইফুল, কবির উদ্দিন, আতাউর, আলম, তাইজুল, ফারুক এবং বক্করের পরিবারে। শুক্রবার দুর্গম বাবুর চরে গিয়ে দেখা যায়, পানি কমেছে। হাঁটুপানি ভেঙে এসে কৃষ্ণা বালা বলেন, ‘নিজেরে তো খাবার নাই, গরু ছাগল নিয়া বিপদে পড়ছি। ঘাস ঢুবি গেইছে। পোয়াল (খড়) ভিজি পচি গেইছে। এ্যালা কী খাওয়াই।। ছাগলের জন্য পাটের পাতা ছিড়ি আনলোং। উয়াকে খাওয়াম।’

হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, অপ্রতুল ত্রাণসহায়তার কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দুর্গম চরাঞ্চলের অবস্থা খুবই খারাপ।
ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, চলতি বন্যায় প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩৮ মেট্রিক টন চাল, ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার উপবরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।