সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনের নামে যেসব নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়েছে, তা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির সময়ে চিন্তার বাইরে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙিয়ে তিনি আজ বুধবার সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল আজ সকাল ১০টা ২০ মিনিটে শিক্ষার্থীদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান। এরপর বেলা সোয়া ১১টার দিকে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টা ৫৪ মিনিটে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে আসেন। এরপর চারটার দিকে তিনি অনশনস্থলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হক তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘এই যে তারা (আন্দোলনরত শিক্ষার্থী) কী পরিমাণ কষ্ট করেছে, সেইটা আমি নিজের চোখে দেখা না পর্যন্ত বুঝতে পারি না। তারা যেন খেতে না পারে, খাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের নিষ্ঠুরতা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে করা হবে, সেটা চিন্তার বাইরে। আমি আশা করব, সরকার যেন বিষয়টা বিবেচনা করে দেখে।’
আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা অপচেষ্টার নিন্দা জানিয়েছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁর ভাষায় এগুলো অমানবিক, নিষ্ঠুর ও দানবীয় ছিল। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, সরকারের উচ্চমহলের অনুরোধে তিনি এখানে এসে শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙিয়েছেন। তাঁকে দেওয়া কথা রাখা হবে, সেই আশা তাঁর।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল আরও বলেন, ‘আমি এখানে আসার আগে আমার সঙ্গে সরকারের অনেক উচ্চমহল থেকে কথা বলেছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে এখানে এসেছি। আমি তাদের অনুরোধ করব, তারা আমাকে যে কথাগুলো দিয়েছে, সেই কথাগুলো যেন রক্ষা করে। আমি আর এই ছাত্রদের ভেতরে কোনো পার্থক্য নাই।
কাজেই আমাকে দেওয়া কথা যদি রক্ষা করা না হয়, তাইলে আমি বুঝে নেব, তারা শুধু ছাত্রদের সঙ্গে নয়, আমার সঙ্গে এবং এই দেশের যত প্রগতিশীল মানুষ আছেন, তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কাজেই আমি আশা করব, তারা আমাকে যে কথা দিয়েছে, সেই কথাগুলো যেন রাখে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমি অনশন ও আন্দোলন দুইটাকে ভিন্নভাবে দেখি। এই আন্দোলনে তাদের যে উদ্দেশ্য, সেই আন্দোলন করার জন্য অনশন করার প্রয়োজন নাই। কারণ, যে মানুষটার জন্য তারা অনশন করছে, তার জন্য প্রাণ দেওয়াটা সমীচীন না। তারা যদি আন্দোলন করতে চায়, করবে, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। এই বাচ্চাগুলো যে সুন্দরভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করেছে, আমি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তারা যেভাবে এটা ম্যানেজ করেছে, এখানে কোনো ডাক্তার নেই, এখানে সব ডাক্তারি প্রক্রিয়া তারা নিজেরা করেছে, ছেলেমেয়েদের সুস্থ রেখেছে, হাসপাতালে নিয়ে গেছে। যখন যেটা প্রয়োজন, তারা করেছে। তারা যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে, আমি দেখে অত্যন্ত আশাবাদী হয়েছি। ভবিষ্যতে এরা আমাদের দেশের নেতৃত্ব দেবে, নিশ্চিতভাবে আমি বলতে পারি।’
মুহম্মদ জাফর ইকবাল আরও বলেন, ‘আমি তিন বছর আগে যখন রিটায়ার্ড (অবসর) নিয়ে চলে যাই, উনাকে (উপাচার্য) একটা চিঠি লিখে গিয়েছিলাম। আমি সেখানে স্পষ্ট করে লিখেছিলাম, যদি আপনি এগুলো না করেন, তাহলে ছাত্রদের যে ক্ষোভ আছে, সেটা বিক্ষোভে রূপ নেবে। একদম অক্ষরে অক্ষরে আমার কথা ফলেছে।’
১৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অসদাচরণসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েক শ ছাত্রী। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে এবং তাঁদের লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। পরে এই আন্দোলন উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়।