বান্দরবানের উজানীপাড়ার একটি রেস্তোরাঁয় মুন্ডি খেতে ভিড় জমিয়েছেন তরুণ–তরুণীরা
বান্দরবানের উজানীপাড়ার একটি রেস্তোরাঁয় মুন্ডি খেতে ভিড় জমিয়েছেন তরুণ–তরুণীরা

মুন্ডি-লাকসু থেকে বাঁশের হেবাং, পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো কোথায় পাবেন

পাহাড়ি খাবারের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কম তেল ও মসলার ব্যবহার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, বাঁশকোঁড়ল, জুমের ফসল, পাহাড়ি মরিচ কিংবা শুঁটকির ব্যবহার—এসব খাবারে আলাদা স্বাদ এনে দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্কের ছাপও ফুটে ওঠে খাবারের ধরনে।

‘পাহাড়ি খাবার কোথায় পাওয়া যাবে? অনেক দূর থেকে ঘুরতে এসেছি, পাহাড়ি খাবার না খেলে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা অপূর্ণ থেকে যাবে।’

বান্দরবান শহরের একটি রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন মিজানুল ইসলাম। তিনি এসেছেন রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে। তাঁর সঙ্গে এসেছেন আরও সাত বন্ধু। পাহাড়, ঝরনা আর মেঘ দেখার পর ফেরার আগে এখন তাঁদের খোঁজ স্থানীয় খাবারের।

অবশ্য শুধু মিজানুল নন, তাঁর মতো আরও অনেক পর্যটকের কাছে পাহাড়ি খাবার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। তাঁদের ভাষ্য, পাহাড়ে এসে সমতলের খাবার খেলে চলে না, খেতে হবে পাহাড়ের নিজস্ব খাবার। কেউ প্রথমবার পাহাড়ে এসে কৌতূহল নিয়ে জানতে চান মুন্ডি বা হেবাং কী? আবার অনেকে শুধু ঐতিহ্যবাহী এসব খাবারের স্বাদ নিতেই বারবার ছুটে আসেন পার্বত্য অঞ্চলে।

পাহাড়ি খাবারের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কম তেল ও মসলার ব্যবহার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, বাঁশকোঁড়ল, জুমের ফসল, পাহাড়ি মরিচ কিংবা শুঁটকির ব্যবহার—এসব খাবারে আলাদা স্বাদ এনে দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্কের ছাপও ফুটে ওঠে খাবারের ধরনে।

রেস্তোরাঁ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, পাহাড়ি খাবার বলতে শুধু বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন খাবার নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি খাদ্যসংস্কৃতিকে বোঝায়। বান্দরবানের মুন্ডি, তোজাহ ও লাকসু, রাঙামাটির হেবাং, বাঁশকোঁড়লভাজি, শুঁটকির নানা পদ কিংবা কলাপাতায় মোড়ানো পিঠা—সবকিছুরই আলাদা পরিচিতি রয়েছে। পর্যটকদের কাছে এসব খাবারের চাহিদা সব সময়ই বেশি।

চাল দিয়ে তৈরি নুডলস দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু মুন্ডি

যেখানে পাবেন মুন্ডি

বান্দরবানের মারমা জনগোষ্ঠীর অন্যতম জনপ্রিয় খাবার ‘মুন্ডি’। এটি মূলত জুমের আতপ চাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের নুডলস। আতপ চাল কয়েক দিন ভিজিয়ে রেখে মণ্ড তৈরি করা হয়। পরে বিশেষ পদ্ধতিতে সেই মণ্ড থেকে নুডলসের মতো সরু মুন্ডি বের করে সেদ্ধ করা হয়।

পরিবেশনের সময় গরম পানি, তেঁতুলের হালকা টক রস ও চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট মিশিয়ে একটি বাটিতে দেওয়া হয়। সঙ্গে মুরগির কাবাব থাকলে স্বাদ আরও বাড়ে। বান্দরবান শহরের উজানীপাড়া, মধ্যমপাড়া ও বালাঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মুন্ডির দোকানগুলোতে পর্যটকের ভিড় দেখা যায়। তবে মুন্ডিকে অনেকেই হালকা খাবার বা বিকেলের নাশতা হিসেবেই বেশি পছন্দ করেন।

পাহাড়ের জনপ্রিয় বাঁশের পদ

ঝাল-স্বাদের লাকসু, সাদামাটা তোজাহ

দুপুর কিংবা রাতের খাবারে জনপ্রিয় লাকসু ও তোজাহ। লাকসু মূলত মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি একধরনের চাটনি। কাঁচা পাহাড়ি মরিচ ও বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়। ঝালের পরিমাণ বেশি হওয়ায় অনেকের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের।

অন্যদিকে তোজাহ বেশ সাদামাটা একটি খাবার। সেদ্ধ সবজি চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট ও মরিচের সঙ্গে খাওয়া হয়। কম মসলা ও তেলের ব্যবহার থাকলেও স্বাদের ভিন্নতায় এটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।

পার্বত্য অঞ্চলেও মুন্ডি, হেবাং, বাঁশকোঁড়লসহ নানা খাবার দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। তাই পর্যটকেরা পাহাড়ে এসে এসব খাবারের স্বাদ নিতে আগ্রহী হন
মংক্যশৈায়েনু মারমা, লেখক ও গবেষক

বাঁশের চোঙায় রান্না হেবাং

পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত খাবার হেবাং। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এর জনপ্রিয়তা বেশি হলেও এখন বান্দরবানেও সহজে পাওয়া যায়।

হেবাং আসলে রান্নার একটি পদ্ধতি। বাঁশের চোঙার ভেতরে মুরগি, মাছ বা অন্য মাংস মসলা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে ভরে আগুনে রান্না করা হয়। অনেক সময় কলাপাতায় মুড়িয়েও একই পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। বন থেকে সদ্য কাটা বাঁশের চোঙায় রান্না হওয়ায় খাবারে আলাদা সুগন্ধ তৈরি হয়। কম তেল ও মসলায় রান্না হওয়ায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের কাছে এই খাবারের বিশেষ কদর রয়েছে।

বাঁশের চোঙায় রান্না হেবাং ঢালা হচ্ছে বাটিতে। খাগড়াছড়ির সিস্টেম রেস্তোরাঁয়

বাঁশকোঁড়লের মৌসুম

বর্ষা এলেই পাহাড়ে শুরু হয় বাঁশকোঁড়লের মৌসুম। জুন থেকে জুলাই মাসে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও এটি অন্যতম আকর্ষণীয় খাবার। সদ্য গজানো বাঁশের কোড়ল প্রথমে সেদ্ধ করা হয়। এরপর বিশেষ কায়দায় কেটে চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট ও মরিচ দিয়ে ভাজি করা হয়। মারমা ভাষায় এই খাবার পরিচিত ‘ভাচ্চুরিমালাহ’ নামে। এ ছাড়া পাহাড়ের কালো, লাল ও সাদা বিন্নি চালের ভাত, শুঁটকির নানা পদ, তাজা মাছের রান্না এবং বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠাও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

পাহাড়ের সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করেন গবেষক মংক্যশৈায়েনু মারমা। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন , কোনো অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুই সেখানে কী ধরনের ফসল ও খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে উঠবে, তা অনেকাংশে নির্ধারণ করে। খাদ্যের সহজলভ্যতার ভিত্তিতে যেমন একটি অঞ্চলের নিজস্ব খাদ্য–ঐতিহ্য তৈরি হয়, তেমনি পার্বত্য অঞ্চলেও মুন্ডি, হেবাং, বাঁশকোঁড়লসহ নানা খাবার দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। তাই পর্যটকেরা পাহাড়ে এসে এসব খাবারের স্বাদ নিতে আগ্রহী হন।