ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাত গতকাল বুধবার নানা অভিযোগে সিলেট, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুরে নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত সাত নির্বাচনী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিলেট: জেলার জৈন্তাপুর উপজেলায় জামায়াত নেতার বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে এলাকাবাসী ও স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের হাতে আটক হন এক পোলিং এজেন্ট। এ ঘটনার পর আনোয়ার হোসেন নামের ওই পোলিং এজেন্টকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। গতকাল দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সিলেট-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত জৈন্তাপুর উপজেলার ভিত্রিখেল পূর্ব গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় মানুষের হাতে আটক হওয়া আনোয়ার হোসেন ভিত্রিখেল উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের পোলিং এজেন্ট ছিলেন। তিনি পেশায় মাদ্রাসার শিক্ষক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের আগের দিন আনোয়ার হোসেন দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে আসেন। তবে তিনি একপর্যায়ে ভিত্রিখেল পূর্ব গ্রামে জামায়াতের এক নেতার বাড়িতে দাওয়াত খেতে যান। সেখানে পোলিং কর্মকর্তার সঙ্গে জামায়াত নেতার গোপন বৈঠক চলছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির সমর্থক ও এলাকাবাসী ওই বাড়ি ঘেরাও করে আনোয়ার হোসেনকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ওই পোলিং এজেন্টকে সেখান থেকে নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, ভিত্রিখেল কেন্দ্রের এক পোলিং এজেন্ট রাতের বেলা দুই ঘণ্টা কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করার অভিযোগ ওঠে। তিনি কোথায় ছিলেন, এ বিষয়ে তিনি সদুত্তরও দিতে পারেননি। তাই তাঁকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের একটি ভোটকেন্দ্র থেকে একজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও একজন পোলিং এজেন্টকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রাত দেড়টার দিকে সদর উপজেলার নলডুগি মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্র থেকে তাঁদের আটক করা হয়।
আটক দুজন হলেন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এম এ ওসমানি ও পোলিং এজেন্ট মো. ইকবাল হোসেন। এম এ ওসমানি দক্ষিণ টুমচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মো. ইকবাল হোসেন গন্ধব্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রের পাশের এক জামায়াত নেতার বাড়িতে খাবার খেতে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের ঘেরাও করেন। পরে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের আটক করে।
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. রেজাউল হক বলেন, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্ট কেন্দ্রের পাশে একটি বাড়িতে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকজন তাঁদের ঘেরাও করে রাখেন। পরে প্রশাসনের নির্দেশে তাঁদের চন্দ্রগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
খাগড়াছড়ি: জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন—এমন অভিযোগ করেছেন খাগড়াছড়িতে ধানের শীষের প্রার্থী ওয়াদুদ ভূইয়া। পরে জনতা তাঁদের ঘেরাও করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ইউএনও এসে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা করে নেন।
আমতলী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি সেন্টারে কাজ করতেছিলাম। মাহমুদুল হাসান ভোরে নামাজ পড়তে গেছিল। পরে সেখানে অনিয়মের অভিযোগে মাহমুদুল হাসানকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’
সিরাজগঞ্জ: জেলার রায়গঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে চারজনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় একটি ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল রাতে উপজেলার ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের কয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেন।
জানা গেছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় চারজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাসুদ রানা এ অর্থদণ্ড দেন। এ ঘটনায় ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবুল খায়ের শেখকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘুড়কা শাখার কর্মকর্তা।
ফরিদপুর: জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে দেখা করায় ফরিদপুর-১ ও ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনের সদর ও মধুখালী উপজেলার দুটি কেন্দ্র থেকে দুজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার মধ্যরাতে তাদের প্রত্যাহার করে রাতেই নতুন দুই কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফরিদপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
যাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে তাঁরা হলেন ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে শহরের হিতৈষী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. আল আমিন এবং ফরিদপুর-১ (আলফাডাঙ্গা-বোয়ালমারী-মধুখালী) আসনে গাজনা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আশাপুর সিনিয়র দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের জাহিদুল ইসলাম। আল আমিন অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এবং জাহিদুল ইসলাম মধুখালী সরকারি আইনউদ্দীন কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
ওই দুই কেন্দ্রে নতুন যে দুই কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে তাঁরা হলেন হিতৈষী উচ্চ বিদ্যালয়ে ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রভাষক সোহানুর রহমান এবং আশাপুর সিনিয়র দাখিল মাদ্রাসায় মধুখালী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস বলেন, আশাপুর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মধুখালী উপজেলার বাসিন্দা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লার সঙ্গে কেন্দ্রের একটি কক্ষে দেখা করেন। এরপর এলাকাবাসী বিষয়টি টের পেয়ে কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নেন এবং এতে বিশৃঙ্খলা হওয়ায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
এই কর্মকর্তা বলেন, ফরিদপুরের হিতৈষী স্কুল কেন্দ্রে রাতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন ফরিদপুর জেলা জামায়াতের শুরা সদস্য প্রফেসর বিল্লাল। পরে বিএনপির কর্মীরা বিষয়টি টের পেয়ে কেন্দ্রে ঢুকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার রুমে জামায়াত নেতাকে দেখতে পান। এ নিয়ে তখনই হট্টগোল শুরু হয়। এজন্য তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।