
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চুরির অপবাদে তিন শিশুর হাত বেঁধে গ্রাম ঘোরানোর পর দুই শিশুর চুল কেটে দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় আগাম জামিন নিতে আজ বৃহস্পতিবারও আদালতে এসেছিলেন আড়াইহাজারের গোপালদী পৌরসভার মেয়র হালিম সিকদার। এ সময় নির্যাতনের শিকার তিন শিশু এবং তাদের অভিভাবকেরা মেয়রের সঙ্গে ছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত জামিনের আবেদন না করেই ফিরে যান মেয়র। মেয়রের পক্ষের আইনজীবী ফজলে রাব্বি জামিন আবেদন না করার প্রসঙ্গে বলেন, ‘মেয়র আজ এসেছিলেন। জামিন আবেদনের কাগজপত্রও প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর ছেলে এসে জানালেন, তাঁরা আজ জামিন আবেদন করবেন না। শুক্র-শনিবার আদালত বন্ধ থাকবে। রোববার উচ্চ আদালত কিংবা নারায়ণগঞ্জে আগাম জামিন চাইতে পারেন।’
ফজলে রাব্বি নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুর ছোট বোনের স্বামী। অভিযোগ আছে, এ ঘটনায় মেয়রের আগাম জামিনের ব্যবস্থা করতে গত বুধবার সংসদ সদস্য আদালত প্রাঙ্গণে আসেন। এ সময় তিনি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরে কথা বলেন। মেয়রের মামলার বিষয়টি দেখার জন্য সংসদ সদস্য তাঁর বোনজামাইকে বলে যান।
মেয়রের সঙ্গে থাকা তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং নারায়ণগঞ্জ আদালতের দুজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বুধবারের পর বৃহস্পতিবার সকালেও মেয়র আদালতে এসেছিলেন। সকাল নয়টার দিকে তিন শিশু ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে মেয়র আদালত এলাকায় আসেন। তিনি আদালত এলাকার একটি মাঠে ভুক্তভোগী এক শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে তাঁর গাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় তিন শিশু ও মামলার বাদী মো. রমজান মেয়রের আইনজীবীর পাশের একটি কক্ষে অবস্থান করেন। পরে মামলার বাদী ও শিশুরা বেলা ১১টায় আদালত চত্বরে ছেড়ে যায়। তখনো মেয়রকে আদালত এলাকায় দেখা গেছে। বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার পর মেয়র একটি কালো রঙের গাড়িতে করে আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যান।
মেয়রের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানায়, বুধবার রাতে মেয়র তাঁর রামচন্দ্রদীর বাড়িতে ছিলেন। ভোরে তিনি বাড়ি ছাড়েন। বাড়িতে লোকজনের প্রবেশেও বিশেষ সতর্কতা ছিল। এ সময় মুঠোফোনও ছিল বন্ধ।
এদিকে বুধবার রাতের পর থেকে মামলার বাদীর মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ আছে। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মেয়রের সঙ্গে বৃহস্পতিবার আদালতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এর বাইরে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। নির্যাতনের শিকার ১১ বছর বয়সী শিশুর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
মঙ্গলবার দুপুর থেকে মেয়র হালিম সিকদারের মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে। ফলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। মামলার ৪৮ ঘণ্টা পরও মেয়রকে কেন গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) আবির হোসেন বলেন, ‘মামলার পর থেকেই মেয়র গা ঢাকা দিয়েছেন। তাঁর মুঠোফোনের নম্বরসহ সব ডিভাইস বন্ধ। তবে তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’
পুলিশ পলাতক বললেও বুধ ও বৃহস্পতিবার আদালত প্রাঙ্গণে মেয়রের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য। আমাদের প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ নেই।’
মামলার প্রধান আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাঁর গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খেলাঘর আসরের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখা গেল, তিনি চায়ের দোকানে বসে গল্প করছেন। অথচ পুলিশ বলছে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মনে করছি, মেয়রের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও মেয়রের গ্রেপ্তার দাবি করছি।’
গত সোমবার সকালে চুরির অপবাদে আড়াইহাজারে রামচন্দ্রদী বাজারে ৭, ৮ ও ১১ বছর বয়সী তিন শিশুর হাত বেঁধে গ্রাম ঘোরানোর পর দুই শিশুর মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পরের তিন নির্যাতনের শিকার এক শিশুর বাবা বাদী হয়ে মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হালিম শিকদারসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং চার থেকে পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে আড়াইহাজার থানায় একটি মামলা করেন। পুলিশ মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এই ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর থেকে ভুক্তভোগী শিশুদের পরিবারের সদস্যদের মামলা ও হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন মেয়র। এরই মধ্যে বুধবার দিনভর মামলায় জামিনের জন্য মামলার বাদী, ভুক্তভোগী শিশু ও তাঁদের অভিভাবকদের নিয়ে মেয়র নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে দৌড়ঝাঁপ করেন। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু আদালত প্রাঙ্গণে এসে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিসহ বিভিন্ন দপ্তরে যান। এ সময় গুঞ্জন ওঠে, সংসদ সদস্য মেয়রের পক্ষে তদবির করতেই আদালতে এসেছেন। পরে সংসদ সদস্য তা অস্বীকার করেন এবং শিশুদের সঙ্গে হওয়া ঘটনাকে ‘ওয়ান কাইন্ড অব শাসন’ বলে মন্তব্য করেন।