গণসংযোগ করছেন রংপুর-৪ আসনে বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী প্রগতি বর্মণ। মঙ্গলবার দুপুরে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী ইউনিয়নের হাতিরামের দীঘি গ্রামে
গণসংযোগ করছেন রংপুর-৪ আসনে বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী প্রগতি বর্মণ। মঙ্গলবার দুপুরে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী ইউনিয়নের হাতিরামের দীঘি গ্রামে

রংপুর-৪ : মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রগতি বর্মণের গণসংযোগ

তাঁর প্রচার-প্রচারণা কম। নির্বাচনী এলাকায় চোখে পড়ার মতো ব্যানার-ফেস্টুনও নেই। তবু তিনি নির্বাচনী মাঠে এবার যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। তিনি প্রগতি বর্মণ, রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে এবার প্রথম সংসদ সদস্য পদের প্রার্থী।

প্রগতি বর্মণের বাড়ি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী ইউনিয়নের হাতিরাম গ্রামে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত এই প্রার্থী লড়ছেন কাঁচি প্রতীক নিয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পেশা হিসেবে তিনি টিউশনি করান বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে প্রগতি বর্মণের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। এ সময় তিনি দাবি করেন, প্রচলিত ‘বুর্জোয়া’ রাজনীতির বাইরে গিয়ে মানুষের জন্য রাজনীতি করার অঙ্গীকার নিয়ে তিনি গ্রামে গ্রামে যাচ্ছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচার ও ইশতেহারেও তুলে ধরেছেন নারীর অধিকার ও কৃষির সংস্কারের কথা।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ৫ লাখ ৯ হাজার ৯০৬ ভোটারের বিপরীতে এ আসনে প্রার্থী ৯ জন। প্রগতি বর্মণ ছাড়াও এ আসনে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী আখতার হোসেন। বিএনপির মোহাম্মদ এমদাদুল হক (ভরসা), জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু সাহমা, বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জল চন্দ্র রায় প্রার্থী হয়েছেন। জয়নুল আবেদীন ও শাহ্ আলম বাসার স্বতন্ত্র প্রার্থী।

গণসংযোগে যাচ্ছেন মা-বাবা
বিশাল জনসভা বা পথসভা নয়, বরং প্রগতি বর্মণের প্রচার চলছে ব্যক্তিগত গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে। এসব গণসংযোগে তিনি তাঁর মা মলিনা রায় ও বাবা পীযূষ কান্তি বর্মণকেও নিয়ে যান। মলিনা রায় প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মেয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে চান। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেও চাকরি করেননি। তাঁরা মা–বাবা হিসেবে মেয়ের কথাগুলো মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছেন।
পীরগাছা উপজেলার হাতিরাম গ্রামের সুবলা রানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রার্থী ভালো। তবে প্রচার-প্রচারণা কম। নীতি-আদর্শের কথা বলেন। এখন ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁকে ভোট দেবেন কি না।’

বললেন কৃষি ও কৃষকের সংকটের কথা
প্রগতি বর্মণের নির্বাচনী এলাকা পীরগাছা ও কাউনিয়া আলুর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার কৃষকেরা উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খান উল্লেখ করে প্রগতি বর্মণ বলেন, ‘এখানকার কৃষকদের অবস্থা ভীষণ খারাপ। তাঁরা যখন উৎপাদন করতে যান, তখন সারের দাম আকাশচুম্বী থাকে, সেচের জন্য বিদ্যুতের দামও বাড়তি। কিন্তু বিক্রি করতে গেলে ন্যায্যমূল্য পান না। কিছুদিন পরপরই আমাদের কৃষকেরা ধান-আলু রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ করেন।’ এ সংকট নিরসনে তিনি নির্বাচিত হলে সংসদে কৃষিবান্ধব আইন পাসের প্রস্তাব করবেন বলে জানান। এর মাধ্যমে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

নারী অধিকার ও শ্রমের স্বীকৃতি
রংপুর-৪ আসনে একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে প্রগতি বর্মণ নারীদের শ্রমের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতির দাবি তুলেছেন। গ্রামীণ নারীরা ভোরে ধান রোপণ থেকে শুরু করে মাড়াই পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করলেও অর্থনীতিতে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি নেই বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মায়েরা জমিতে কাজ করেন, গৃহস্থালীর প্রধান ভূমিকায় থাকেন। কিন্তু তাঁদের স্বীকৃতির জায়গা আমাদের অর্থনীতির মধ্যে নাই। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে।’

প্রগতি বর্মণ বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের মধ্যে বন্দী রাখার চিন্তা কেবল অবাস্তবই নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। নারীরা কাজ না করলে গার্মেন্টস বা কৃষি খাত—কোনোটাই সচল রাখা সম্ভব নয়।

নির্বাচনী ইশতেহারে মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন প্রগতি বর্মণ। পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার জরাজীর্ণ রাস্তাঘাট সংস্কার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় উন্নত চিকিৎসার পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁর মতে, এখানকার তরুণ প্রজন্মের জন্য কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও গণভোট প্রসঙ্গ
নির্বাচনী পরিবেশে সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করেন প্রগতি বর্মণ। তাঁর মতে, বড় দলগুলোর বিপুল অর্থবিত্তের বিপরীতে তাঁর দল কেবল গণচাঁদার ওপর ভিত্তি করে প্রচার চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হওয়া দরকার নীতিনৈতিকতার দিক থেকে। আপনি কত যোগ্য ও সৎ, সেটা জনগণকে বোঝার সুযোগ দিতে হবে। সেখানে টাকার মাপকাঠি নিয়ে আসলে বৈষম্য রয়েই যায়।’ সংবিধান সংস্কার এবং গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জানানো হয়নি।