
‘আমার বাবা-ভাই কেউই বেঁচে নেই। এখন আমার স্বামী-সন্তানও মারা গেছে। আমি একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার ছেলের এক বছরের একটি বাচ্চা আছে। তার ভবিষ্যৎ কী হবে? সরকারের কাছে একটাই দাবি, আমার স্বামী-সন্তানের লাশগুলো যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে দেন। আমি শেষবার নিজের চোখে স্বামী-সন্তানকে দেখতে চাই।’
স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের মেড্ডা এলাকার পারভীন আক্তার। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় সকালে তুরস্কে শোবার ঘরে তিনজন প্রবাসী মারা যান। তাঁদের মধ্যে পারভীন আক্তারের স্বামী তারেক মিয়া (৪৫) ও ছেলে সাব্বির মিয়া (২২) রয়েছেন। এ ছাড়া ফেনীর এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাঁর নাম-পরিচয় জানা যায়নি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সাব্বিরের চাচাতো ভাই লিটন মিয়া (২৬) ও আরেকজন (নাম-ঠিকানা জানা যায়নি) তুরস্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তুরস্কে তারেকের সহকর্মীর বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। আবার সিলিন্ডার থেকে ছড়ানো গ্যাসের বিষক্রিয়া থেকেও তাঁরা মারা যেতে পারেন। সেখানকার একটি হাসপাতালে তাঁদের লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে।
মৃত তারেক মিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে তুরস্কে পাড়ি জমান তারেক মিয়া। সেখানকার আরবিল এলাকায় একটি প্লাস্টিক কোম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। দুই বছর আগে একমাত্র ছেলে সাব্বিরকে তুরস্কে নিয়ে যান তিনি। নিহত সাব্বিরের স্ত্রী ও এক বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। সাব্বিরের স্ত্রী ও সন্তান ঢাকায় থাকেন।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, তারেক ও সাব্বিরসহ পাঁচজন একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষে থাকতেন। মঙ্গলবার রাতে কোম্পানির কাজ শেষে তাঁরা রাতের খাবার খেয়ে ঘরে ঘুমাতে যান। এর পর থেকে তাঁদের আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। বুধবার সকালে ওই প্লাস্টিক কারখানা কর্তৃপক্ষ তাঁদের অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে সেখানকার একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত তারেক মিয়ার সহকর্মীরা বুধবার রাতে মৃত্যুর বিষয়টি তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানান।
এদিকে একসঙ্গে পরিবারের দুজনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁদের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন পরিবার ও স্থানীয় লোকজন।
নিহত সাব্বিরের খালা লুৎফা বেগম বলেন, ‘পরিবারের দুজনের হঠাৎ এমন মৃত্যুতে আমরা বাক্রুদ্ধ। তাঁদের লাশ কীভাবে দেশে আনব, তা নিয়ে আমরা দিশাহারা। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া লাশ দেশে আনা সম্ভব নয়। সবার কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চাই।’