
১০ বছর আগে ঢাকায় এক দুর্ঘটনায় বড় ভাইকে হারিয়েছেন জাহিদুল ইসলাম। এবার একসঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও হারালেন তিনি। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে জাহিদুল এখন শোকাহত। বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন তিনি। মাঝেমধ্যে চোখ মেলে বিলাপ করে বলছেন, ‘তুমরা, ফিরে আস। কেনো তুমাদের রেখে আসছিলাম!’
গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় জসীমউদ্দীন রোডের মোড়ে প্যারাডাইজ টাওয়ারের সামনে প্রাইভেট কারের ওপর বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার পড়ে নিহত হন জাহিদুলের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম (২৬) এবং দুই সন্তান জান্নাতুল (৬) ও জাকারিয়া (৪)। এ দুর্ঘটনায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়। একসঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হারানোর শোক সইতে পারছেন না জাহিদুল।
জাহিদুলের বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের আগপয়লা গ্রামে। পুরো গ্রামেই এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আজ মঙ্গলবার সকালে জাহিদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ জাহিদুলের বাড়িতে ভিড় করছেন। প্রতিবেশীরা জাহিদুলকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই তিনি শান্ত হচ্ছিলেন না। কিছুক্ষণ পরপর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। প্রতিবেশীরা তাঁকে মাথায় পানি দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন।
বারবার বিলাপ করে জাহিদুল বলছিলেন, ‘ওই ঢাকায় ভাইকে হারিয়েছি। এবার ওই ঢাকায় সব শেষ হয়ে গেল। এই জীবন দিয়ে আর কী হবে? কার জন্যে বাঁচব?’
জাহিদুলের বাবা মৃত কাজী আকন্দ। তিনি পেশায় কৃষক ছিলেন। ছয় ভাই–বোনের মধ্যে জাহিদুল ইসলাম সবার ছোট। বাবার মৃত্যুর পর জাহিদুলের বড় ভাই জহুরুল ইসলাম সংসারের হাল ধরেছিলেন। ঢাকায় জহুরুল নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। সেখানে জাহিদুলও ছিলেন। তবে বছর দশেক আগে ঢাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে পড়ে জহুরুলের মৃত্যু হয়। এরপর পুরো সংসারের দায়িত্ব পড়ে জাহিদুলের ওপর। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন জাহিদুল। পরে স্থানীয় বাজারে ইজিবাইক মেরামতের কাজ শুরু করেন। ভালোই চলছিল সংসার। তবে আবার একটি দুর্ঘটনায় জাহিদুলের পরিবার তছনছ হয়ে গেল।
জাহিদুলের চাচা সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এমন মৃত্যু তাঁরা কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না। জাহিদুলের স্ত্রী ও ছেলে–মেয়েরা ঢাকায় বিয়ে খেতে গিয়েছিল। গতকালই তাঁদের বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না। এটা একটা হত্যা। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, এত ব্যস্ত রাস্তার মধ্যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই কাজ চলছিল। কোনো যানবাহনও বন্ধ করা হয়নি। এই শোক মানার মতো নয়। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের কঠিন বিচার চাই। একই সঙ্গে এই পরিবারকে যেন সরকার সাহায্য করে।’
জাহিদুলের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার দক্ষিণখানের কাওলা এলাকার মো. হৃদয়ের সঙ্গে আশুলিয়ার রিয়া মনির গত শনিবার বিয়ে হয়। গতকাল সোমবার বিকেল চারটার দিকে কাওলায় বউভাতের অনুষ্ঠান শেষে নবদম্পতি হৃদয়-রিয়া, হৃদয়ের বাবা আইয়ুব আলী ওরফে রুবেল, রিয়ার মা ফাহিমা বেগম, খালা ঝর্ণা এবং তাঁর দুই সন্তান জাকারিয়া ও জান্নাতুল প্রাইভেট কারে আশুলিয়ায় যাচ্ছিলেন। পথে উত্তরায় জসীমউদ্দীন রোডের মোড়ে বিআরটি প্রকল্পের একটি গার্ডার হঠাৎ গাড়ির ওপর পড়লে হৃদয় ও রিয়া বাদে বাকিরা ঘটনাস্থলেই মারা যান।