ডুবে যাওয়া জমির পাশে ধান শুকাচ্ছেন কৃষক আলাউদ্দিন। বৃহস্পতিবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বড় হাওর এলাকায়
ডুবে যাওয়া জমির পাশে ধান শুকাচ্ছেন কৃষক আলাউদ্দিন। বৃহস্পতিবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বড় হাওর এলাকায়

‘খেত বেচ্চে এবার ঋণ দিতে অইবো’

‘অহন আমার সব শেষ, আমি এক্কেবারে সর্বহারা হয়ে গেছি। কষ্টটা হইলো, খলাত ধান আন্নেও ধান নিতে ফারিনি। সব ধান জালায়া নষ্ট হয়ে গেছে।’

এভাবেই দুর্দশার অবস্থা বর্ণনা করছিলেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের গোপদিঘি ইউনিয়নের বজরপুর হাওরের কৃষক ফাইজুল ইসলাম। তিনি পাঁচ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। দুই একর ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তিন একর জমির ধান কেটেছিলেন। কিন্তু সেই ধানও খলায় থেকে চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ মণ ধান।

চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ফাইজুলের মতো অনেক চাষিই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ফাইজুল আরও বলেন, ‘অহন এই টেহা কেমনে দেম? দিলে তো বাড়িভিটা বেচা ছাড়া উফাই নাই, গতি নাই। আমরার তো মনে হরেন ছয় মাসে একটা ইনকাম। আমরা বেটাইনতের এনতো কাত্তি মাসে ঋণ আন্নে ডারসে গিরস্থি করি আর বৈশাখ মাসে ঋণ উলারে দেই, আমরারও খোরাক চল্লে যায়। ইবার তো কিস্তাই (কোনো কিছু) নাইগে, এহন খায়ামই কী আর মাজনরে কী দেম?’

একই এলাকার কৃষক আবু তাহেরের চার একর জমির মধ্যে অর্ধেক জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে আর অর্ধেক ভেসে আছে। তিনি বলেন, ‘দুই হাজার টাকার কামলা লাগাইয়া ভাইসা থাহা খেতের ধান আনতে ফারিনি। কামলা আইছে। আয়া খেত দেইখা জোঁকের ভয়ে ধান কাটা তইয়া ভাগছে। এহন এরম সময়ে মেঘ–বৃষ্টি হয় জানি, কিন্তু জর্মের পরে একলাগাড়ে এমন বৃষ্টি দেহি নাই।’

মাথার ওপর ঋণের বোঝা আর ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণের চিন্তা নিয়ে আবু তাহের বলেন, ‘ইবার যে অবস্থা অইছে, যেহানে আমার ৪০০–৫০০ মণ ধান অইতো, হেইনো অহন ২০ মণ ধানও থাকতো না। এই ধান তো কামলারেই অইতো না। এহন ঋণ দেম কেমনে আর খায়াম কইত্তে? একমাত্র ঢাহা (ঢাকা) যাওয়া ছাড়া রাস্তা নাই। আর ঢাহায় গিয়া কিতা করাম, হয় রিকশা চালাইতে অইবো, নাহয় দিনমজুরির কাম করতে অইবো। এর ফরেও যাওন লাগব, চাইরটা ডাল–ভাত তো ফেডে দেওন লাগবো।’

একইভাবে কষ্টের কথা শোনান করিমগঞ্জের বড় হাওরে প্রায় ১৪ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করা কৃষক আলাউদ্দিন। তিনি জানান, ব্যাংক, মহাজন ও আড়তদারের কাছ থেকে আগাম ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি জমি চাষ করেছিলেন। এক ছটাক ধানও তিনি এবার ঘরে আনতে পারেননি। ঋণের চিন্তায় এখন তাঁর ঘুম নেই। তিনি বলেন, মহাজনের কাছ থেকে এক হাজার টাকায় ৫০০ টাকা সুদে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। সেটা কীভাবে শোধ করবেন, এখন সেই চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ‘ধান দিব বলে আড়তদারের কাছ থেকে আগেই আড়াই লাখ টাকা নিয়া রাখছিলাম। এহন তো আড়তেও এক কেজি ধান দিতে পারি নাই। এহন চিন্তায় আমার ঘুম হারাম। মনে হয়, খেত বেচ্চে এবার ঋণ দিতে অইবো। আর খেতই কার কাছে বেছাম? এবার যে অবস্থা হইছে, মনে হয় না সামনে কেউ আর কৃষি চাষে আগ্রহ দেখাইবো।’

‘আল্লাহর রহমতে তিন দিন ধরে রইদ পাইতাছি। তবে খলা ভিজা। ধান শুকানোর জায়গা নাই। তাই ফথের মধ্যেই ধান শুকাইতেছি।’ নিকলী-করিমগঞ্জ সড়কে পা দিয়ে ধান নাড়াতে নাড়াতে কথাগুলো বলেন কিষানি রহিমা বেগম। গত ২৬ এপ্রিল থেকে টানা ১০ দিন বৃষ্টি শেষে গত মঙ্গলবার থেকে দুই দিন কিছুটা রোদ পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তাঁরা ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো, খলায় ধান বেচাকেনাসহ খড়ের গাদা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে করিমগঞ্জ, নিকলী, ইটনার কিছু এলাকায় দেখা যায়, রাস্তাঘাট সব জায়গায় ধান নিয়ে ব্যস্ত সবাই। ধান শুকানোর জন্য জমির ধারে ও খোলা মাঠে তৈরি খলার অনেক জায়গায় এখনো বৃষ্টির পানি জমে থাকায় সড়কজুড়ে ধান নাড়ানো, মাড়াই ও খড় শুকানোর কাজ চলছে।

নিকলী সড়কের ওপর ধানমাড়াই করছিলেন কৃষক সুবহান মিয়া। তিনি বলেন, দুই দিন ধরে বৃষ্টি না থাকায় অনেকটা স্বস্তি পেয়েছেন কৃষকেরা। এভাবে আর কয়টা দিন রোদ পেলে কৃষকেরা কিছুটা হলেও ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার কৃষক। এতে জেলায় আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অনেক কৃষকের অভিযোগ, প্রাথমিক জরিপে সব ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে আসেনি। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানিনিষ্কাশনের পথ পলি জমে বন্ধ হয়ে যাওয়া ও অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো থাকায় বৃষ্টির পানি নামতে পারেনি। এতে বন্যা ছাড়াই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে।