
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে মানববন্ধন করেছে তামিম ইকবাল সমর্থক গোষ্ঠী। মানববন্ধনে বিসিবি পরিচালক নাজমুলকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ক্ষমা না চাইলে চট্টগ্রামে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করারও হুমকি দেওয়া হয়।
আজ রোববার বিকেলে চারটায় চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায় এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের কিংবদন্তি ক্রিকেটার তামিম ইকবালের মানহানি করা হয়েছে। তাঁকে ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা চরম অবমাননাকর। তাই অবিলম্বে এম নাজমুল ইসলামকে বিসিবি থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। মানববন্ধনে বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন, নাজমুল ইসলাম প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে চট্টগ্রামজুড়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
নগর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল বলেন, তামিম ইকবাল চট্টগ্রামের সূর্যসন্তান। তিনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন, বাংলাদেশের সম্পদ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। এমন একজন কিংবদন্তিকে নিয়ে বিসিবির পরিচালক কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পারেন না। এই মন্তব্যের দায় তাঁকে নিতেই হবে। তাঁর পদত্যাগ ছাড়া বিকল্প নেই।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক রিজাউর রহমান বলেন, লাল-সবুজের পতাকা বুকে নিয়ে তামিম ইকবাল সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আজ সেই ক্রীড়াঙ্গনে নষ্ট রাজনীতির সূচনা ঢুকছে। বিসিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসে একজন পরিচালক তামিমকে ভারতের দালাল বলে আখ্যা দেন, এটা শুধু একজন ক্রিকেটারকে নয়, পুরো জাতিকেই অপমান করা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সমর্থকেরা ‘তামিম জাতীয় বীর’, ‘তামিম চট্টলার গর্ব’—এমন স্লোগানসংবলিত ব্যানার হাতে নিয়ে প্রতিবাদ জানান।
সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দলের ভারতে না যাওয়ার প্রসঙ্গে এক অনুষ্ঠানে মতামত দেন তামিম ইকবাল। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই বিসিবির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এরপর তামিমের ওই মন্তব্যের একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। ‘ফ্রেন্ডস’ প্রাইভেসিতে করা সেই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এইবার আরও একজন পরিক্ষিত (পরীক্ষিত) ভারতীয় এজেন্ট এর আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দুচোখ ভরে দেখলো।’
এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ক্রিকেটার, সাবেক খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা একে একে প্রতিবাদ জানান।
ক্রিকেট দলের বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বক্তব্যে আমি হতবাক। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার সম্পর্কে বোর্ড পরিচালকের এমন শব্দচয়ন শুধু রুচিহীনই নয়, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আমাদের ক্রিকেট–সংস্কৃতির পরিপন্থী।’
এ জন্য নাজমুলকে ক্ষমা চাইতে হবে বলেও দাবি তাইজুল ইসলামের, ‘এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে আমি দৃঢ় প্রতিবাদ জানাচ্ছি। দায়িত্বশীল একটি পদে থেকে প্রকাশ্যে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া বোর্ড কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব, নৈতিকতা ও আচরণবিধি নিয়েই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি তাঁকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
কোয়াবের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা এতে স্তব্ধ, বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সফলতম ওপেনার, দেশের হয়ে ১৬ বছর খেলা ক্রিকেটারকে নিয়ে একজন বোর্ড কর্মকর্তার এমন মন্তব্য চরম নিন্দনীয়।’
একই দাবি জানিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মুমিনুল হকও। ফেসবুকে টেস্ট দলের সাবেক এই অধিনায়ক লিখেছেন, সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের মন্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং দেশের ক্রিকেট সমাজের প্রতি অপমানজনক। একজন ক্রিকেটারের প্রতি এমন আচরণ বোর্ডের দায়িত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মুমিনুল আরও লিখেছেন, ‘একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে ন্যূনতম সম্মানও দেওয়া হয়নি; বরং তাঁকে জনসমক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছে। এত বড় দায়িত্বে বসে কোথায় এবং কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই শিষ্টাচারও দেখা যায়নি। আমি এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া ও তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি। বিসিবিকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রতিবাদে সরব হয়েছেন জাতীয় দলের পেসার তাসকিন আহমেদও। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রাণ। সেই ক্রিকেটে বড় অবদান রাখা সাবেক জাতীয় অধিনায়ককে ঘিরে সাম্প্রতিক এক মন্তব্য অনেককেই ভাবিয়েছে। দেশের একজন সাবেক ক্রিকেটারকে উদ্দেশ করে এ ধরনের বক্তব্য দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সহায়ক নয় বলেই মনে করি। আশা করি, সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল অবস্থান নেবে।’
এ ঘটনায় বিসিবির কাছে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও। কোয়াবের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের একটি মন্তব্য ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-এর নজরে এসেছে। আমরা এতে স্তব্ধ, বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সফলতম ওপেনার, দেশের হয়ে ১৬ বছর খেলা ক্রিকেটারকে নিয়ে একজন বোর্ড কর্মকর্তার এমন মন্তব্য চরম নিন্দনীয়। শুধু তামিমের মতো একজন বলেই নয়, দেশের যেকোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে এমন মন্তব্য অগ্রহণযোগ্য এবং পুরো ক্রিকেট সমাজের জন্য অপমানজনক। আমরা এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। একজন দায়িত্বশীল বোর্ড পরিচালক যখন পাবলিক প্ল্যাটফর্মে এমন মন্তব্য করেন, তখন বোর্ড কর্মকর্তাদের আচরণবিধি নিয়েও আমাদের প্রশ্ন জাগে।’