লাঠিতে ভর দিয়ে এলেন। রেলস্টেশন এলাকার একটি ভাতের হোটেল থেকে কিছু পরোটা নিলেন। টুকরা করে ছিটিয়ে দিলেন স্টেশনসংলগ্ন দোকানের টিনের চালে। খাবার পেয়ে ছুটে এল আশপাশের গাছগাছালি থেকে অসংখ্য পাখি। মায়াভরা চোখে পাখিদের খাওয়া দেখছেন বৃদ্ধ লোকটি। খাবার কমে গেলে আবার ছিটিয়ে দিচ্ছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে উঠল রেলস্টেশনের চারপাশ।
সম্প্রতি মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য দেখা গেল রংপুরের অন্নদানগর রেলস্টেশনে। সকাল ছয়টার দিকে যিনি পাখিদের খাওয়াচ্ছেন, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা অনন্ত কুমার বর্মণ। ৭৬ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৬–১৭ বছর ধরে এভাবে পাখিদের খাওয়াচ্ছেন। এ জন্য স্থানীয় লোকজন তাঁকে ‘দয়ালু’ বলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের কারণে তিনি ‘ফাইটার’ নামে বেশি পরিচিত।
অন্নদানগর রেলস্টেশন থেকে পশ্চিমে আধা কিলোমিটার দূরে পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের জাদু লস্কর মৌজায় তাঁর বাড়ি। গাছগাছালিতে ভরা গ্রামটির প্রতিটি বাড়ির পাশে বাগান থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ কানে আসে। মঙ্গলবার সকালে অন্নদানগর রেলস্টেশনে পাখিদের খাওয়ানোর পর স্থানীয় ইউসুফ আলীর চায়ের দোকানে বসলেন অনন্ত কুমার বর্মণ। স্থানীয় বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম, কৃষক হামিদুল, আরেক মুক্তিযোদ্ধার ছেলে আইয়ুব আলী ও পানের দোকানদার শহিদুলও দোকানে ছিলেন।
ক্যামেরা দেখে পঞ্চাশোর্ধ্ব নুরুল ইসলাম কথা তুললেন। চায়ের দোকানের পেছনের পাড়ায় তাঁর বাড়ি। নুরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ থাকি আসার পর থেকে তাঁকে (অনন্ত কুমার) চিনি। উনি এলাকার জামাই। নিজস্ব অনুদান থাকি পাখিক খাওয়ান। ওনার কাছে পয়সা না থাকলেও কারও কাছে সাহায্য নিয়ে খাওয়ান। নিজে না খেয়ে পাখিদের খাওয়ান।’ কৃষক হামিদুল ইসলাম স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘ওনার বাবা অম্বিকা চরণ রায় ছিলেন পীরগাছার সাবেক জোদদার ও ছাওলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁদের ৭০০ বিঘা জমি ছিল। বাড়ি ছিল প্রাচীরঘেরা।’
এবার কথা বলতে শুরু করেন অনন্ত কুমার। জানান, তাঁদের বাড়িতে যে কুয়া ছিল, সেটির ইট তুলে দুটি ঘরের গাঁথুনি হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বললেন, ‘এল্যা কিচ্ছু নাই। কিছু জমি নদীগর্ভে গেছে। কিছু দায়-দয়রাত করি দিছি। পাখিদের যা খাওয়াই, আমিও তাই খাই। না খাওয়া পর্যন্ত নিজেও খাই না। এটা আমার প্রতিজ্ঞা। আমার হিস্ট্রি বহু। আমি সম্পদ হারিয়েছি বাবা; ভালোবাসা নিয়া আছি, এটাই যথেষ্ট। বাকি জীবনটা ওইভাবে যাক। দুঃখও নাই, কষ্টও নাই।’
স্থানীয় লোকজন জানান, প্রেম করে বিয়ে করার পর অন্তত কুমারের পরিবার মেনে নেয়নি। অন্নদানগরে শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী পূর্ণিমা রানীসহ থাকেন। ওই সময় রেলস্টেশনে আড্ডা দিতেন। তখন রেলস্টেশনে খাবার সংগ্রহে আসা পাখিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তৈরি হয়। তখন তিনি পাখিকে খাওয়ানো শুরু করেন। অনন্ত কুমার বলেন, আগে তাঁর স্ত্রী বাড়িতে রুটি করে দিতেন। স্টেশনে এসে পাখিকে ‘আয়, আয়’ করে ডাকতেন। এখন ডাকা লাগে না। তাঁকে রাস্তায় দেখলে পাখি চলে আসে।
১৯৭০ সালে পাশের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন অনন্ত কুমার। চায়ের দোকানে বসা অন্নদানগরের বাসিন্দারা জানান, তখন থেকে বন্ধুবৎসল ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরার পর বন্ধুদের সঙ্গে গানবাজনা করে মাতিয়ে রাখতেন, বিশেষ করে গরিব পরিবারের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা করতেন। এমনও হয়েছে নিজের সম্পদ বেঁচে এলাকার হিন্দু-মুসলমানের মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
অনন্ত কুমার অবশ্য বলেন, তখন মেয়েদের বিয়েতে যৌতুক ছিল বেশি। বেশির ভাগ কৃষক ও শ্রমজীবী বাবা ছিলেন কন্যাদায়গ্রস্ত। বর-কনে সাজানো ছিল তখনকার জন্য ব্যয়বহুল। তাঁর অনেক বন্ধু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কিন্তু দেননি। এ জন্য তিনি ওসব পরিবারের দায়িত্ব নেন। তাঁর হিসাবে এ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব নিয়ে ৮৫ জন দরিদ্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
ইউসুফ আলীর চায়ের দোকানে ঘণ্টাখানেকের আড্ডায় হঠাৎ উপস্থিত হন অনন্ত কুমারের স্ত্রী পূর্ণিমা রানী (৬৫)। মূলত স্বামীকে (অনন্ত) ডাকতে এসেছেন তিনি। আলাপে ঢুকে পূর্ণিমা রানী বলেন, গ্রামের এক লোকের মেয়ের বিয়ে, কিন্তু কাপড়চোপড় কেনার টাকা নেই। তাঁর স্বামী তাঁকে না জানিয়ে তাঁর পরনের শাড়ি-ব্লাউজ নিয়ে ওই মেয়েকে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাক্সের মধ্যোত নয়া শাড়ি-ব্লাউজ তুইছি। কয়েক দিন পর দেখি শাড়ি-ব্লাউজ নাই। আমার পইরবার কাপড় নাই। ওমরা (অনন্ত) নিয়া যায়া কাপড় দিছে। এমন দয়ালু লোক। নিজের কিচ্ছু নেই। তবু সে দান করবে।’
স্বামীর এমন আচরণে কেমন লাগে জানতে চাইলে পূর্ণিমা রানী বলেন, ‘আগোত রাগ হতো। এলা ভালো লাগে। ওমরা মাঝেমধ্যে থাকে না, পুরান বাড়িতে যায়, আমি আসি কোনো দিন। আয় আয় করি ডাক দিই। সব পাখি চলে আসে। খাবার দিই।’ তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ছাড়া স্বামীর আর কোনো আয় নেই। এর মধ্যে ছোট মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করতে ৫ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। ভাতা থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা কেটে রাখে ব্যাংক। বাকি ১০ হাজার টাকা দিয়ে তাঁরা কোনোমতে চলেন, পাখিদের খাওয়ান। পাখিদের খাওয়াতে প্রতি মাসে হোটেলে দুই হাজার টাকা বাকি পড়ে জানালেন তিনি। ভাতার টাকা তুলে তা পরিশোধ করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অনন্ত কুমার ৬ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে স্ত্রীর পাওয়া ৪ শতক জমিতে থাকছেন। নিজস্ব আর কোনো সম্পত্তি নেই। দুই বছর আগে স্ত্রীর জমিতে বীর নিবাস করে দিয়েছে সরকার। তাঁর বড় ছেলে প্রবীণ চন্দ্র কৃষিকাজ করেন। ছোট ছেলে অন্নদানগর বাজারে চায়ের দোকান করেন। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে ইতি রানী স্বাস্থ্য পরিদর্শক।
অনন্ত কুমারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, একজন মানুষের আদর্শ কী হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘সততা, চরিত্র, ব্যবহার আর কর্ম। এই চার জিনিস যার ভেতর আছে, সে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। সে অনেক দিন বাঁচি থাকবে।’ নিজের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘একটাই চাওয়া, আমি ভালোভাবে মানুষ ও পশুপাখির ভালোবাসা নিয়ে যেন যেতে পারি। আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা অনন্ত কুমারকে কাছ থেকে দেখে আসছেন অন্নদানগর দ্বিমুখী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও পীরগাছা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনন্ত কুমার ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বিয়ে করে অন্নদানগরে বসবাস শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার আগে খুব কষ্ট ছিলেন। এখন অবস্থা কিছুটা ভালো। তিনি পরোপকারী ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ। পকেটে ২০ টাকা থাকলে কোনো ভিক্ষুক টাকা চাইলে তিনি ২০ টাকাই বের করে দেবেন—এমন মানুষ তিনি।