এক যুগ ধরে তালাবদ্ধ সরকারি গণপাঠাগার। গত শনিবার বিকেলে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের চত্বরে
এক যুগ ধরে তালাবদ্ধ সরকারি গণপাঠাগার। গত শনিবার বিকেলে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের চত্বরে

এক যুগ ধরে তালাবদ্ধ একমাত্র সরকারি গণপাঠাগার

দরজায় ঝুলছে তালা। এক কক্ষবিশিষ্ট গণপাঠাগারটির জানালার কাচ দিয়ে দেখা যায়, ভেতরে একটি তাকে শতাধিক জরাজীর্ণ বই। পাশে ছয়টি চেয়ার। একসময় যেখানে প্রতিদিন জমে উঠত পাঠকদের আসর, সেই পাঠাগার এখন স্মৃতি।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদসংলগ্ন একমাত্র সরকারি ওই গণপাঠাগারটির কার্যক্রম এক যুগ ধরে বন্ধ। এতে স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২০১৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভবনের টিনের ছাউনির একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর বৃষ্টির পানি ঢুকে ভেতরে থাকা পাঁচ শতাধিক বই নষ্ট হয়। আবারও বন্ধ হয়ে যায় পাঠাগারটি। এরপর আর পাঠাগার চালু হয়নি।

শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারটির দরজা তালাবদ্ধ, নামফলকও নেই। পাঠাগারটির আশপাশ ও দেয়ালজুড়ে জন্মেছে আগাছা।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন থানা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান ভূঞার উদ্যোগ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় এখানে শত শত মূল্যবান বই ছিল। প্রতিদিন মানুষের উপস্থিতিতে জমজমাট থাকত পাঠাগারটি। তবে দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনায় কয়েক দফায় বন্ধ হয়েছে পাঠাগারটির কার্যক্রম।

২০০৪ সালের বন্যায় পাঠাগারের ভেতরে পানি ঢুকে বই ও আসবাবের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে উপজেলা প্রশাসন নতুন করে বই সংগ্রহ ও আসবাব সংস্কার করে পাঠাগারটি আবার চালু করে। কিন্তু এক বছরের মাথায় আবারও বিপর্যয় নামে। ২০০৮ সালে পাঠাগার থেকে আট শতাধিক মূল্যবান বই ও বেশ কিছু আসবাব চুরি হয়ে যায়। এরপর আবার বন্ধ হয়ে যায় এর কার্যক্রম।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে পাঠাগারটি চালুর দাবিতে এর চত্বরে আমরণ অনশন শুরু করেন ‘ধরমপাশা সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনের সদস্যরা। আন্দোলনের মুখে উপজেলা প্রশাসন পাঠাগারটি পুনরায় চালু করে। তবে সেটিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভবনের টিনের ছাউনির একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর বৃষ্টির পানি ঢুকে ভেতরে থাকা পাঁচ শতাধিক বই নষ্ট হয়। আবারও বন্ধ হয়ে যায় পাঠাগারটি। এরপর আর পাঠাগার চালু হয়নি।

ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইয়াদুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার জন্য উপজেলার একটি গণপাঠাগার প্রয়োজন। পাঠাগারটি দ্রুত চালুর জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

উপজেলা সদরের নতুনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক বদিউল ইসলাম বলেন, একসময় পাঠাগারটিতে পাঠকদের জমজমাট আসর বসত। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে বই ও পত্রিকা পড়তে আসতেন। কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি। জ্ঞান অর্জনের এমন সুযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

সরকারি অর্থায়নে দুই সপ্তাহ আগে ওই গণপাঠাগারটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। পাঠাগারটি চালুর জন্য খুব শিগগির শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করা হবে।
জনি রায়, ইউএনও, ধর্মপাশা

এক যুগ ধরে পাঠাগারটি বন্ধ থাকলেও এটি চালু করার বিষয়ে কারও তেমন আগ্রহ নেই বলে অভিযোগ করেন ধরমপাশা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি আনিসুল হক। তিনি বলেন, পাঠাগার থেকে চুরি হওয়া বই ও আসবাব আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি।

তবে পাঠাগারটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় গত শনিবার রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি অর্থায়নে দুই সপ্তাহ আগে ওই গণপাঠাগারটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। পাঠাগারটি চালুর জন্য খুব শিগগির শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করা হবে। এ ছাড়া পাঠাগারটির আনুষঙ্গিক যেসব সমস্যা রয়েছে, সেসব চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।