পানিতে তলিয়ে গেছে ধান। গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকায়
পানিতে তলিয়ে গেছে ধান। গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকায়

কিশোরগঞ্জে হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, কাঁদছেন কৃষক

গতকাল রোববার বিকেল থেকে আজ সোমবার বিকেল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টিসহ তুফান ও বজ্রপাত চলছে। বৃষ্টিতে পানি বাড়ার পাশাপাশি বজ্রপাতের ভয়ে মাঠে ধান কাটতে নামতে পারছেন না কৃষকেরা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁরা।

বিস্তীর্ণ হাওরে দুই দিন আগেও যেখানে ধান বাতাসে দুলছিল, পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষকেরা। তবে টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে হাওরের অনেক জায়গার ধান তলিয়ে গেছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই দিনে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকাসহ ইটনা ও মিঠামইন হাওরের কিছু এলাকায় প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

আজ বিকেলে অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর হাওরে দেখা গেছে, কৃষকেরা ‘গলাডোবা’ ধান কাটছেন। নৌকা দিয়ে ধান কেটে পাড়ে আনা হচ্ছে। অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ করে কোনো রকমে অনেকে ধান কেটে তুলছেন। কেউ আবার শেষ সম্বল হিসেবে ডুব দিয়ে কিছু পচা ধান কেটে কলাগাছের ভেলার ওপরে তুলে এনেছেন। অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আর যে ধান কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন পানির নিচে। হাঁটু বা কোমরপানিতে নেমে কেউ কেউ ধান কাটলেও অনেক কৃষকই আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আব্দুল্লাহপুর হাওরে এবার ১০ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন কৃষক রতন মিয়া। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব খরচই চলে এই ধানের আয় থেকে। কিন্তু শ্রম-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার তলিয়ে গেছে পানিতে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি। সামনে একটি বছর কীভাবে চলবে, ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন—এই দুশ্চিন্তায় দিশাহারা রতন মিয়া।

কলিমপুর গ্রামের এই কৃষকের পরিবারে সদস্যসংখ্যা ১১ জন। গতকাল বিকেলে তলিয়ে যাওয়া জমির ধান দেখে হাওরপাড়ে বসে তিনি কাঁদছিলেন। রতন মিয়া বলেন, ‘ভাই, সংবাদ কইরা কী আর অইব, আমার সর্বনাশ অয়া গেছে। সোনার ধানগুলা পাইক্কা গেছিল। আর চার-পাঁচটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলাম?’

শুধু রতন মিয়াই নন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তাঁর মতো ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজারো কৃষক। পরিবেশ না মেনে হাওরে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পলি জমে নদী ভরাট হওয়া এবং ফসল রক্ষার বাঁধের ত্রুটির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।

একই সময়ে ভেজা কাপড়ে ধানখেত থেকে উঠে আসেন কাবিল মিয়া নামের আরেক কৃষক। হাতে থাকা আধা পাকা ধান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দেহুইন, দুই-এক দিন গেলেই কাটার চেষ্টা করতাম। পানির নিচের ধান এহন কেমনে কাটাম? ধান পইচ্চা কালা অয়া যাইতাছে। চোখের সামনে সোনার ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছে-কইলজাডারে মানাইতে পারতেছি না।’বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কৃষকেরা ‘গলাডোবা’ ধান কাটছেন। নৌকা দিয়ে ধান কেটে পাড়ে আনা হচ্ছে। রোববার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর এলাকায়

একই গ্রামের কৃষক হযরত আলী বলেন, উজানের পানি নামলেই এই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। হবিগঞ্জ সীমান্তের শিবপুর এলাকার খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর ৯ একর জমির মধ্যে সাত একরই তলিয়ে গেছে। পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ইতিমধ্যে জমিতে পানি জমে থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।

এ সময় আরেক কৃষক রমজান আলী বলেন, দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার বোরো আবাদ করেছিলেন। ধান বিক্রি করেই ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ধান পাকতে শুরু করতেই তা পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন ঋণ শোধ ও সংসার চালানো-দুটোই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে পাকা ধান তলিয়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে এ–সংক্রান্ত সঠিক হিসাব নেই। তবে কৃষকদের দাবি, সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে চাষ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান আজ বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তবে গতকাল বিকেলে থেকে আজ বিকেল পর্যন্ত থেকে থেকে বৃষ্টিসহ ঝড় তুফান হওয়ায় আর বজ্রপাতে ভয় থাকায় কৃষকেরা মাঠে নামছেন না। তিনি জানান, ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে, এর আগে পানি নেমে গেলে ক্ষতি কম হতে পারে। তাই ৮০ শতাংশ ভাগ পাকা ধান কেটে ফেলার নির্দেশ দেন তিনি। এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, আজ পর্যন্ত হাওরে ৪৮ শতাংশ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে।