
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে ১২টি জবাই করা ঘোড়ার মাংস ও একটি জীবিত রুগ্ণ ঘোড়া জব্দ করা হয়েছে। আজ বুধবার সকালে উপজেলার আনারপুরা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১০০ মিটার অদূরে নির্জন একটি ঘর থেকে এসব মাংস জব্দ করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, কয়েক মাস ধরে রাতের আঁধারে আনারপুরা বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন পল্লী বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের পেছনে ওই পরিত্যক্ত ঘরে ঘোড়া জবাই করত একটি চক্র। দিনের বেলা ঘরের আশপাশে পশুর হাড়গোড় দেখা গেলেও প্রকৃত ঘটনা তাঁরা জানতেন না। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় ওই ঘরের দিকে নজরদারি শুরু করেন গ্রামবাসী। আজ ভোরে ফজরের নামাজ শেষে স্থানীয় একজন সেখানে ঘোড়া জবাইয়ের বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তিনি স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ১২টি জবাই করা ঘোড়া দেখতে পান। স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িত ব্যক্তিরা দ্রুত পালিয়ে যান। বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশ ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘোড়ার মাংস জব্দ করে মাটিচাপা দেন এবং জীবিত একটি রুগ্ণ ঘোড়া উদ্ধার করেন।
স্থানীয় তোফাজ্জল মিয়াজী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যখন ভোরে ঘটনাস্থলে যাই, তখন ঘরের ভেতরে ও আশপাশে জবাই করা ঘোড়ার মাংস ও চারদিকে রক্তের দাগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। জবাই করা ঘোড়াগুলোর মধ্যে একটি গর্ভবতী ছিল, পাশেই নাড়িভুঁড়ির সঙ্গে একটি বাচ্চার ভ্রূণ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া ঘরের চারপাশে খোঁড়া বড় বড় গর্তে ঘোড়ার হাড় পুঁতে রাখার আলামতও দেখা যায়।’
নাজমুল হোসেন নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, প্রতি রোববার ও বুধবার গভীর রাতে পরিত্যক্ত ঘরের সামনে গাড়ি আসত। সকালে সেখানে রক্ত ও হাড় পড়ে থাকতে দেখা যেত। পরে জানা যায়, একটি চক্র ঘোড়া জবাই করে সেই মাংস বস্তায় করে গরুর মাংস হিসেবে বিভিন্ন হোটেলে সরবরাহ করত। প্রমাণ নষ্ট করতে তারা চামড়া, হাড় ও নাড়িভুঁড়ি গর্ত করে পুঁতে ফেলত। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান আলী প্রথম আলোকে বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। ইতিমধ্যে ঘটনায় জড়িত একটি চক্রের নাম তাঁরা পেয়েছেন। চক্রটিতে সোনারগাঁ ও টঙ্গীর সদস্য আছেন। চক্রের সদস্যরা এসব মাংস বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বিক্রি করতেন বলে জানতে পেরেছেন। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে মাংস কোথাকার রেস্তোরাঁয় বিক্রি হতো।
দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, জায়গাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১০০ মিটার পশ্চিমে নির্জন একটি স্থান। পরিত্যক্ত ঘরটির আশপাশে গাছগাছালিতে ঘেরা। আশপাশে ২০০ মিটারের মধ্যে কোনো বাড়িঘর নেই। ঘরের মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে আছে। ঘরের সামনে কয়েকটি প্লাস্টিকের সাদা বস্তা দেখা যায়। জবাই করা ঘোড়ার মাংস ওই ঘরের সামনে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থলের পাশে কাঁচা সড়কে কঙ্কালসার রুগ্ণ একটি ঘোড়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় কয়েকজন বলেন, সকালে ওই ঘোড়াটিকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঘোড়াটি হাঁটতে পারে না। হাঁটতে গেলে পড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজিজুল হক বলেন, রাতের আঁধারে জবাই করা ঘোড়াগুলোর প্রতিটিই রুগ্ণ ও কাজের অনুপযোগী। জীবিত ঘোড়াটিই তার বড় প্রমাণ। তিনি বলেন, ‘আমাদের গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যেটুকু অংশ পড়েছে, সেই অংশে কম করে হলেও ছোটবড় ৩০টির বেশি হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে। এসব রেস্তোরাঁয় খাওয়া মানুষের অধিকাংশই ভাসমান। ধারণা করা হচ্ছে, ওইসব রেস্তোরাঁয় এসব ঘোড়ার মাংস গরুর মাংস হিসেবে বিক্রি করা হতো।’
গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে জানার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাই। তদন্ত করে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জবাই করা ঘোড়ার মাংস প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে এখন থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। এসব রেস্তোরাঁর মাছ-মাংস কোথা থেকে আসে, সে বিষয়ে তদারকি করা হবে।