দৌড় শুরুর মুহূর্ত। আজ শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজার সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামে
দৌড় শুরুর মুহূর্ত। আজ শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজার সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামে

কুয়াশায় মোড়ানো চা ও রাবার বাগানের পথে পথে দৌড়

কুয়াশায় ডুবে আছে চারদিক। পৌষের শীতে স্থবির হয়ে আছে সবকিছু। চোখের সামনে খুব বেশি দূর দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যেই অনেকে ছুটছেন একটা গন্তব্যের দিকে। কেউ হেঁটে, কেউ রিকশায়, কেউবা সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ প্রাইভেট কারে। এমন অন্ধকারময় সকালে মৌলভীবাজার এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়াম এলাকা একদল মানুষের উপস্থিতি, পদচারণ আর হইচইয়ে মুখর হয়ে গেছে। শীত ও কুয়াশাকে তেমন পাত্তা দিচ্ছিলেন না কেউ। ওই স্থানে (স্টেডিয়াম এলাকা) তখন আয়োজন চলছে মৌলভীবাজার বেঙ্গল কনভেনশন হাফ ম্যারাথন ২০২৬–এর। ‘সুস্থতার জন্য দৌড়’ এই মন্ত্র নিয়ে এটা আয়োজকদের পঞ্চম আসর।

শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয় সংক্ষিপ্ত দৌড়। আজ শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজার সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামে

আজ শুক্রবার সকালে যখন গভীর কুয়াশা নেমেছে মৌলভীবাজার শহরে, শহরের বাইরে তখন লেপ-কাঁথা মুড়ে বিছানায় ছিলেন বেশির ভাগ মানুষ। এর মধ্যে একদল নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, এমনকি শিশু-কিশোর—এই উষ্ণতাকে দূরে ঠেলে ঘরের বাইরে ছুটে এসেছেন। সকাল ছয়টার আগেই কয়েক শ মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠে স্টেডিয়াম এলাকা। সবার সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে কুয়াশা আর শীত সেখানে জায়গা করতে পারছে না। সকাল ছয়টাতেই ম্যারাথন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কুয়াশার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তারা আগের রাতেই ঘোষণা দিয়ে সময় আধা ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়েছিলেন। সাড়ে ছয়টা বাজতেই দৌড়ের লোকজন যাঁর যাঁর স্থানে দাঁড়িয়ে পড়েন। ম্যারাথন আয়োজকেরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। দৌড়ে অংশ নেওয়া সবাই পরেছেন কালো ব্যাজ। এরপর জাতীয় সংগীত শেষে ম্যারাথন শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। আগের রাতে (গতকাল বৃহস্পতিবার) বেঙ্গল কনভেনশন হলে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় টি-শার্টসহ আনুষঙ্গিক জিনিসের কিট ব্যাগ। ম্যারাথনটি ছিল তিনটি পর্বে বিভক্ত। ২১ কিলোমিটার, ১০ কিলোমিটার এবং শিশুদের জন্য সংক্ষিপ্ত একটি দৌড়।

রাবার বাগানের কুয়াশামাখা পথে ছুটছেন দৌড়ে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা। আজ শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজারের হামিদিয়া রাবার বাগানে

স্টেডিয়াম থেকে দৌড় শুরু হয়। তারপর ওয়াপদা রোড, শহীদ মুকিত সড়ক, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক-কালেঙ্গা সড়ক ও কালেঙ্গা বাজার দিয়ে হামিদিয়া রাবার বাগান, বড়বাড়ি, দেওরাছড়া চা-বাগান হয়ে কমলগঞ্জের ছয়ছিরি দীঘিরপার পর্যন্ত ছিল দৌড়ের অপর প্রান্ত। এর মধ্যে ১০ কিলোমিটারে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা হামিদিয়া রাবার বাগান থেকে ইউটার্ন হয়ে পুনরায় স্টেডিয়ামে ফিরে আসেন। অন্যদিকে ২১ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা ছয়ছিরি দীঘিরপার থেকে ইউটার্ন নিয়ে স্টেডিয়ামে ফিরেছেন।

এই সময় রাবার বাগান ও চা-বাগানের পথটি ছিল কুয়াশায় মোড়ানো। পথে পথে পানি ও স্যালাইন নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকেরা দাঁড়িয়েছিলেন। পথপ্রদর্শক হয়ে দিচ্ছিলেন সামনে যাওয়ার দিকনির্দেশনা। শত শত মানুষের দৌড়ে পুরো এলাকাতে শীতের বদলে উষ্ণতার ছোঁয়া লেগেছে। অনেকেই ঘুমঘুম চোখে ঘরের বাইরে এসে এই দৌড়বিদদের ছুটে চলা প্রত্যক্ষ করেন। সবার কাছেই শীতের সকালটা উষ্ণ ও আনন্দঘন হয়ে ওঠে।

১০ কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নেওয়া তাহিয়া তাবাসসুম ভালো লাগার অনুভূতি প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মা–বাবাসহ পরিবারের চার সদস্যই এই প্রথম কোনো ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন।

ঢাকা থেকে সপরিবার এসে দৌড়ে অংশ নেওয়া মো. শাহাদাৎ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দৌড়ের ট্র্যাক খুব সুন্দর ছিল। খুব ভালো লেগেছে। তবে বয়সভিত্তিক গ্রুপ করা হলে আরও ভালো হতো।’

কবি মহিদুর রহমান বলেন, ‘কনকনে শীত, তবু যেন এক অন্য রকম উত্তাপ। গায়ে পাহাড়ি হাওয়ার স্পর্শ মেখে পায়ে পায়ে সে কী দুরন্ত গতি! হাফ ম্যারাথনে কত শত প্রতিযোগী। কত মানুষের মেল। টানা ক্লান্তির মাঝেও যেন একচিলতে আনন্দের গল্প।’

সবশেষে স্টেডিয়ামের ভেতর আয়োজন করা হয় শিশুদের সংক্ষিপ্ত দৌড়। অংশগ্রহণকারী শিশুরা দৌড় শুরুর ঘোষণা দিতেই মাঠের ভেতর ছুটে গেছে, যার যার গতিতে গন্তব্যে পৌঁছেছে।

ঘন কুয়াশার ভেতর চা-বাগানের পথ দিয়ে চলছে ম্যারাথন। আজ শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজারের দেওরাছড়া চা-বাগানে

১০ কিলোমিটার দৌড়ে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন ফারিহা জান্নাত পারভিন, দ্বিতীয় মাহবুবা আহমেদ (মারিয়া), তৃতীয় জোনাকী আক্তার, চতুর্থ শ্রাবণী শীল ও পঞ্চম শাকিলা আক্তার। একই (১০ কিলোমিটার) গ্রুপে ছেলেদের মধ্যে প্রথম দ্বীপ তালুকদার, দ্বিতীয় তোফায়েল হোসেন, তৃতীয় আরিফ রানা, চতুর্থ এমডি ওসমান গনি ও পঞ্চম মাহফুজ আহমেদ। ২১ কিলোমিটারে ছেলেদের মধ্যে প্রথম আশরাফুল আলম, দ্বিতীয় মইনুল আহমেদ সরওয়ার, তৃতীয় মিলন গোয়ালা, চতুর্থ জাহিদুল ইসলাম ও পঞ্চম বিভাষ কানুনগো। একই (২১ কিলোমিটার) গ্রুপে মেয়েদের মধ্যে প্রথম তাবাসসুম ফেরদৌস, দ্বিতীয় আফসানা হালিম, তৃতীয় নুসরাত জাহান, চতুর্থ শাহ তামান্না সিদ্দিকা এবং পঞ্চম মোছাম্মাৎ নাসরিন আক্তার।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এবার ৮০০ জন বেঙ্গল কনভেনশন হাফ ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ কিলোমিটারে ৫২০ জন, ২১ কিলোমিটারে ২০০ জন এবং শিশু ৮০ জন অংশ নেন।

বেঙ্গল কনভেনশন হাফ ম্যারাথনের অন্যতম আয়োজক সঞ্জীব মীতৈ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের পজিটিভ দিক হচ্ছে ম্যারাথনে অন্যবারের তুলনায় বৃহত্তর সিলেটের দৌড়বিদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। স্থানীয় লোকজনের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা মনে করছি এই উদ্যোগ-আয়োজনে এটাই আমাদের সফলতার দিক।’