
পাবনা ও নাটোরের ৩৮ জন কৃষক নিজেদের উৎপাদিত ৫২ পদের ফলমূল ও সবজি দিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এর মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ ছিল ১৬ কেজি ওজনের একটি ওলকচু। এটি কয়েকজন কৃষক বিভাগীয় কমিশনারের হাতে তুলে দেন।
৫২ পদের মধ্যে আরও ছিল গাজর, টমেটো, আলু, বেগুন, বাদাম, পেঁয়াজ, রসুন, বরবটি, ড্রাগন, পেঁপে, সুগন্ধী চাল, পেয়ারা, কলা, শসা, মুলা, মিষ্টিকুমড়া, ঢ্যাঁড়স, আমড়া, করলা, লাউ, পাতাকপি।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটার দিকে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের হলরুমে কৃষকেরা এই শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় তাঁরা নিজেদের উৎপাদিত ফসল বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা ও কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেন বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ওরফে কুল ময়েজ। তিনি কুল চাষের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ‘কুল ময়েজ’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। এ জন্য তিনি পুরস্কারও পেয়েছেন।
কৃষককে ঋণ দেওয়ার দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, এনজিও এক সপ্তাহ পর থেকেই কিস্তি আদায় শুরু করে। এক সপ্তাহের মধ্যে তো আর ফসল হয় না।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার উল্লেখ করে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, উৎপাদিত ফসল বিপণন করতে গিয়ে তাঁরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন। তাঁদের তিন চাকার যানবাহন (ভটভটি) ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু পুলিশ ধরে জরিমানা করে। তাঁদের দাবি, কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার জন্য আলাদা সড়ক (সার্ভিস লেন) দিতে হবে, না হলে ভটভটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে।
কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের ডাকনাম কিতাব। ঈশ্বরদীতে লিচু উৎপাদনে বিপ্লব ঘটানোর কারণে এখন তাঁর নাম হয়ে গেছে ‘লিচু কিতাব’। তিনি বলেন, লিচু সংরক্ষণে তাঁদের কোনো ব্যবস্থা নেই। আহরণের একদিনের মধ্যে বাজারজাত করতে না পারলে লিচু নষ্ট হয়ে যায়। বাইরের দেশে লিচু থেকে স্পিরিট তৈরি করা হয়, যেটা ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া প্রক্রিয়াজাত করে জুস তৈরি করতে পারলেও কৃষকের উপকার হয়।
কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আলী বলেন, এখন সার নিয়ে সংকটের কথা উঠছে। এখন চাষিদের জমিতে কী ফসল আছে। এই ফসলে কখন কোন সার দিতে হবে, সেই অনুযায়ী যদি বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী যদি চাষিদের দেওয়া হয়, তাহলে সার নিয়ে কেনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু গড়ে মাসে মাসে একটা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তিনি বিষয়টি কৃষি বিভাগের নজরে আনার জন্য অনুরোধ জানান।
আরেকজন চাষি দেশি রসুনের দাম কমের জন্য ক্রেতাদের দেশপ্রেমকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, দেশপ্রেম থাকলে বাইরের রসুন ক্রেতারা বেশি দাম দিয়ে কিনত না। আরেকজন বলেন, কৃষক পেঁয়াজের দাম পান না। আরও নানা বিষয় তাঁরা তুলে ধরেন।
বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ নিজেও একজন কৃষিবিদ। অনুষ্ঠানের অপর দুই অতিথি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) শাহানা আখতার জাহান কৃষিবিদ। তাঁরা কৃষকদের সমস্যাগুলো শোনেন। নিজ নিজ জায়গা থেকে সমাধানের চেষ্টার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে দেশে কৃষি বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও স্বীকার করেন।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কৃষি একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও শিল্প। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ফসল চাষ করা হয় আর এর নান্দনিক দিকটা হচ্ছে শিল্প। অনুষ্ঠানের একজন কাঁঠালচাষির কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লাল কাঁঠাল চাষ করার জন্য চাষিদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ছোট ছোট আকারের কাঁঠালের চাহিদা বেশি। কারণ, একটা বড় কাঁঠাল ভেঙে এক দিনে শেষ করা যায় না। এই ছোট জিনিসই এখন স্মার্ট হিসেবে ধরা হয়।
দেশি রসুনের দাম কম হওয়া প্রসঙ্গে বিভাগী কমিশনার বলেন, এখনকার গৃহিণীদের নাকি বড় রসুন পছন্দ। ছোট রসুনের পেছনে সময় বেশি দিতে হয়।
ইউসুফ আলী আরও বলেন, ‘কৃষকদের মধ্যে বেশি সার ব্যবহারের একটা প্রবণতাও দেখা যায়। আমরা কৃষির ওপরের দিকটা দেখি। আমাদের মাটির দিকে তাকাতে হবে, সেখানে শিকড় যায়। জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। তাহলে রাসায়নিক সারের চাহিদা অর্ধেক কমে যাবে।’
এ সময় কৃষির দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার জন্য কাজ করার আশ্বাস দেন বিভাগীয় কমিশনার। সবজি ও ফলমূল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তিনি কৃষকদের ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে কৃষক সমিতির পাবনা জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. রাসেল, ঈশ্বরদী উপজেলার সহসভাপতি তোহুরুল ইসলাম, আবু তালিব জোয়ারদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।