হাওরে ধানের খলায় কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গোবিন্দপুর এলাকায়
হাওরে ধানের খলায় কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গোবিন্দপুর এলাকায়

স্বস্তির রোদে প্রাণ ফিরেছে হাওরে, খলায় বেড়েছে কর্মব্যস্ততা

এক সপ্তাহ আগে ধানমাড়াই করেছিলেন কৃষক মোস্তফা মিয়া (৬০)। সেই ধান স্তূপ করে খলায় রেখেছিলেন। টানা বৃষ্টির কারণে ধান আর শুকাতে পারেননি। ধানে এখন অঙ্কুর গজিয়েছে। আজ রোববার সকাল থেকে রোদ ওঠায় সেই ধান খলায় শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছেন স্ত্রী ও দুই ছেলে।

শুধু মোস্তফা মিয়ার পরিবার নয়, হাওরে রোদ ওঠায় ধান কাটা ও শুকাতে ব্যস্ত রয়েছেন এমন হাজারো কৃষক পরিবারের লোকজন। এক সপ্তাহ পর যেন হাওরে আবার প্রাণ ফিরেছে। বৈশাখের চিরচেনা রূপে ফিরেছে হাওরের চেহারা। রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে দেখার হাওরের গোবিন্দপুর খলায় গিয়ে এই দৃশ্য চোখে পড়ে।

শহর থেকে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক ধরে সেখানে যেতে যেতে সড়কের ওপর ধান শুকাতে মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। কিছুদূর পরপরই হাওরপারে একেকটি খলা। নারী, পুরুষ, শিশু—সবাই যোগ দিয়েছে ধান তোলার কাজে। সড়কের পূর্ব পাশেই হাওর। হাওরপারেই খলায় ধান রাখা, মাড়াই ও শুকানো হয়। বৈশাখজুড়ে এসব খলায় কিষান-কিষানিরা মহাব্যস্ত থাকেন।

সুনামগঞ্জের চারটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত দেখার হাওর। এই হাওরে প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। হাওরের কয়েকটি বড় খলার মধ্যে গোবিন্দপুর একটি। সেখানে কেউ ধান রোদে নাড়ছেন। কেউবা বাতাসে ধান উজিয়ে ছিটা ছাড়ানোতে ব্যস্ত। শুকানো ধান ট্রাক্টর, কেউবা ঠেলাগাড়ি দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। খলাতেই রয়েছে অনেকগুলো খুপরি। সেখানে কাজের ফাঁকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন নারী-পুরুষেরা। পাশেই হাওরের একেবারে তীরে জমি থেকে ধান কেটে এনে স্তূপ করে রাখছেন কৃষকেরা। সেখানেই মেশিন দিয়ে মাড়াই করা হচ্ছে। হাওরে এই বৈশাখী ব্যস্ততা—সবই সম্ভব হয়েছে রোদ থাকায়। এই রোদ স্বস্তি দিয়েছে দুর্ভোগ-দুর্যোগে পড়া কৃষকদের।

স্তুপ করে রাখা ধান বের করে শুকানোর চেষ্টা চলছে। রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গোবিন্দপুর এলাকায়

কৃষক মোস্তফা মিয়া বলছিলেন, তাঁর ২৮ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমির মধ্যে ১৩ কিয়ার কেটেছেন। ১০ কিয়ার পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি পাঁচ কিয়ার জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। গত শনিবার কেটেছিলেন পাঁচ কিয়ার জমি। ওই দিনই ধান মাড়াই করে খলায় নিয়ে আসেন। কিন্তু পরদিন থেকে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় এই ধান আর শুকানো যায়নি। খলাতেই পলিথিনের চটে চেপে রেখেছিলেন। আজ খুলে দেখেন, অনেক ধানে অংকুর গজিয়েছে।

পাশে থাকা ছেলে নয়ন মিয়া (১৮) বলছিলেন, ‘এই ধানের সব কামে আইত না। তবু রইদ ওঠায় রক্ষা। আমরার লাখান অনেক মানুষের ধান খলাত নষ্ট অইছে।’ মোস্তফা মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৫৫) জানান, এভাবে আর তিন থেকে চার দিন রোদ থাকলে মানুষের যে ধান খলাতে আছে, সব শুকিয়ে তোলা যাবে। গোবিন্দপুর গ্রামের আরেক কৃষক রোমান মিয়া (৪৫) জানান, ‘জমিতে যা যাওয়ার তো গেছে। এখন খলাত যে ধান আছে, সেগুলো যদি তোলা যায়, তাইলেও আমরার জানটা বাঁচব।’

খলায় ছেলেকে নিয়ে একটি খুপরি বানাচ্ছিলেন কৃষক কবির মিয়া (৫০)। কবির মিয়া কিছুটা ক্ষোভ ঝাড়েন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ওপর। বলেন, এই হাওরের বড় ফসল রক্ষা বাঁধ হলো উতারিয়া এলাকায়। হাওরে প্রথমে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়া পানিনিষ্কাশনের জন্য বাঁধটি স্থানীয় লোকজন কেটে দেন। কিন্তু পরদিনই সেটি আবার প্রশাসন ও পাউবোর পক্ষ থেকে কৃষকদের হুমকি দিয়ে মাটি দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। এটি শুরুতে কিছুদিন খোলা থাকলে হাওরে ফসলের ক্ষতি কম হতো।

অতিবৃষ্টি ও ঢলে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে সুনামগঞ্জে জমির ক্ষতির পরিমাণ ১৯ হাজার হেক্টর। এর আগে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয় ২ হাজার হেক্টর। সেই হিসাবে টাকার অঙ্কে সুনামগঞ্জে ধানের ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।

সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয় অতিবৃষ্টি, নামে উজানের পাহাড়ি ঢল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টানা চার দিন হাওরেই নামতে পারেননি কৃষকেরা। এতে অনেক হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। মাঝখানে গত বৃহস্পতিবার এক দিন রোদ উঠলেও কৃষকেরা ধান কাটা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। যে কারণে ধান শুকাতে পারেননি। আজ আবার রোদ ওঠায় মানুষ পুরোদমে হাওরে নেমেছেন।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলার ১৩৭টি হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর। এর মধ্যে জমির মধ্যে হাওরে (নিচু অংশে) জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর। শনিবার পর্যন্ত পর্যন্ত হাওরে কাটা হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ হেক্টর এবং নন হাওরে ১৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৬২ শতাংশ। অতিবৃষ্টি ও ঢলে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে জমির ক্ষতির পরিমাণ ১৯ হাজার হেক্টর। এর আগে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয় ২ হাজার হেক্টর। সেই হিসাবে টাকার অঙ্কে সুনামগঞ্জে ধানের ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেছেন, হাওরে রোদ কৃষকসহ সবার জন্য স্বস্তির। এভাবে আর কটা দিন থাকলে কৃষকেরা বাকি ধান গোলায় তুলতে পারবেন। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁরা এখনো পুরো ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করেননি। এটি করতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।