
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিন ধরে বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অস্বাভাবিক জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে বিভাগের বিভিন্ন উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেই সঙ্গে লঞ্চ ও ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে (চলাচলের পথ) এবং পন্টুন পানিতে তলিয়ে গেছে। যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ওঠানামা করতে হচ্ছে। উঁচু জোয়ারের কারণে নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকায় প্লাবিত হওয়ায় দেখা দিয়েছে দুর্ভোগ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার জোয়ারে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার, ভোলার তেঁতুলিয়া নদীর খেয়াঘাট পয়েন্টে ২৬ সেন্টিমিটার, দৌলতখান পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি ৪৭ সেন্টিমিটার এবং তজুমদ্দিন পয়েন্টে ১ দশমিক ২৭ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া ঝালকাঠির বিষখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার, বরগুনার পাথরঘাটা পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার, বরগুনা সদর পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার, পিরোজপুরে বলেশ্বর নদে ২২ সেন্টিমিটার এবং বরগুনার আমতলী পয়েন্টে পায়রা নদের পানি ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আজ শনিবার দুপুরের জোয়ারেও একই চিত্র দেখা যায়। জোয়ারের সঙ্গে নদীগুলো আবারও ফুঁসে ওঠে।
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর ওডিশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপের প্রভাবে দেশের সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। দমকা হাওয়ার প্রভাবে নদ-নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ার হচ্ছে।আনিসুর রহমান, জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক, বরিশাল আবহাওয়া কার্যালয়
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে এবারই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
লঞ্চ ও ফেরিঘাটে ভোগান্তি
পানি বাড়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ভোলার ইলিশা লঞ্চঘাটে। প্রবল জোয়ারে ঘাটের সব পন্টুন তলিয়ে গেছে। যাত্রীদের অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে ওঠানামা করতে হচ্ছে।
কথা হয় ঢাকা থেকে যুবরাজ-৭ লঞ্চে ইলিশা ঘাটে আসা শাহজাহান মিয়া নামের এক যাত্রীর সঙ্গে। তিনি বলেন, পন্টুন ডুবে যাওয়ায় ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ঘাটটি উঁচু জায়গায় স্থানান্তর করা উচিত।
ভোলা নদীবন্দরের কর্মকর্তা নির্মল কুমার রায় বলেন, গতকাল শুক্রবার বিকেলের শেষ জোয়ারে পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় ঘাটের সব পন্টুন তলিয়ে যায়। এতে প্রতিদিন চলাচলকারী প্রায় ৩০টি লঞ্চের আনুমানিক ৫০ হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়ছেন। কয়েক দিন ধরেই এই পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবল জোয়ারের সময় অস্থায়ীভাবে ঘাট সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বরগুনার পায়রা নদের আমতলী-বরগুনা ফেরিঘাট এবং বিষখালী নদীর বরইতলা-বাইনচটকি ফেরিঘাটের উভয় প্রান্তে গ্যাংওয়ে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে ফেরি পারাপারেও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো যাত্রী।
থেমে থেমে বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে বরিশালসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যায় বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের বাইরে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবারের ঘরবাড়িতে হাঁটুসমান পানি ঢুকে পড়েছে।
চরবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাহিদুল আলম বলেন, কীর্তনখোলা নদীর তীরে ভাঙারপাড় পর্যটন এলাকায় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিন দিন ধরে অস্বাভাবিক জোয়ারে দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে বাঁধের বাইরে বসবাসকারী পরিবারগুলোও চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
একইভাবে বরগুনার তালতলী উপজেলার তুতুলবাড়িয়া, খোট্টারচর, জয়ালভাঙ্গা ও ছোট অংকুজানপাড়া এলাকার বাঁধের বাইরে বসবাসকারী অন্তত ৭০০ পরিবার জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নৌকায় করে মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে এবং স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
খোট্টারচর এলাকার বাসিন্দা ফিজলা বেগম বলেন, ‘আইজ চাইর দিন ধইরা দিন-রাইতের দুইবার জোয়ারে ঘরদুয়ারে কোমরসমান পানি ওঠে। তাই বাড়ি ছাইড়া পরিবার লইয়্যা বান্দার (বাঁধ) ঘরকূলে আশ্রয় নিচ্ছি। এখন মোগো রান্দা-খাওয়াও প্রায় বন্ধ।’
স্থানীয় আবহাওয়া কার্যালয়ের পূর্বাভাস, এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন চলতে পারে। আজ শনিবার দুপুরে প্রথম আলোকে বরিশাল আবহাওয়া কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর ওডিশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপের প্রভাবে দেশের সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। দমকা হাওয়ার প্রভাবে নদ-নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ার হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।