সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত মহন ও সুমনের ছবি দেখাচ্ছেন বাবা গুফফার প্রামাণিক। পাশেই কান্না করছিলেন মা। আজ সোমবার সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালি গ্রামে
সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত মহন ও সুমনের ছবি দেখাচ্ছেন বাবা গুফফার প্রামাণিক। পাশেই কান্না করছিলেন মা। আজ সোমবার সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালি গ্রামে

‘সুখের আশায় দুই ছেলেক বিদেশ পাঠাইছিনু, দেশত থাকলে কষ্ট হলেও জীবত থাকত’

সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁয়। তাঁদের মধ্যে ১২ জন আত্রাই উপজেলার এবং একজন নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। স্বজনেরা গতকাল রোববার রাতে তাঁদের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। আজ সোমবার সকাল থেকে নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আজ সকাল ৯টার দিকে ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

আজ সকালে আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালি, উজানপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি চলছে। এই তিনটি গ্রামেই সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গন্ডগোহালি গ্রামের চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই এলাকার এতজন প্রবাসীর একসঙ্গে মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

গন্ডগোহালি গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের দুই ছেলে মহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক একই কারখানায় কাজ করতেন। তাঁদের চাচা সামাদ প্রামাণিক বলেন, সাত বছর আগে বাড়ির জমি বন্ধক রেখে সৌদি আরবে যান মহন। সেখানে কাজ করে আয় করা টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা জমি ছাড়িয়ে নেন। দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও সৌদি আরবে নিয়ে যান। দুই ভাই একই কারখানায় কাজ করতেন।

নিহত মহন ও সুমনের মায়ের আহাজারি থামছেই না

সামাদ প্রামাণিক আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘কেবল ওদের সংসারে একটা সুখের দেখা মিলেছিল। কিন্তু সেই সুখ আর বেশি দিন রইল না।’

মহন ও সুমনের বাবা গুফফার প্রামাণিক বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘বড় ছেলেটাক পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে পাঠাইছিনু। ছোটটাক পাঠাতে লাগিছে সাত লাখ টাকা। সুখের আশায় ছেলেগুলাক বিদেশ পাঠাইছিনু। এখন মনে হছে, দেশত থাকলে কষ্ট হলেও ছেলেগুলো জীবত থাকত; হামার চোখের সামনে থাকত। আল্লাহ হামার এ কোন পরীক্ষা নিল?’

উজানপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া খাতুন তাঁদের বড় ছেলে ফরিদ শেখকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান ফরিদ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে।

ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’

আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান। তাঁর পরিবারে মা–বাবা ও ছোট বোন আছেন। হাসিবুলের চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানায় শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগায় শ্রমিকেরা বের হতে পারেননি।

নিহত ফরিদ শেখের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি। আজ সোমবার সকালে আত্রাই উপজেলার উজানপৈ গ্রামে

হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে জানিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বিএ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার জীবন যাপন করেন। পরে জীবিকার সন্ধানে ও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিনি সৌদি আরবে যান।

নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত ও লাশ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে বলে জানান নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে। তবে সব প্রক্রিয়া শেষ করে লাশ দেশে আসতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’