
সুন্দরবনের নদী–খালে কাঁকড়ার প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে দুই মাসের জন্য কাঁকড়া ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। এ সময় কাঁকড়া ধরার অনুমতিপত্র ইস্যু বন্ধ থাকায় গভীর বনাঞ্চলে অবস্থান করা জেলেরা লোকালয়ে ফিরে এসেছেন। নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। তারা ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করে। যদি এ সময় কাঁকড়া ধরা হয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে ফিরে আসা শতাধিক কাঁকড়াশিকারি নৌকা নদীতীরে ভেড়ানো রয়েছে। জেলেরা নৌকা থেকে কাঁকড়া ধরার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নামিয়ে নিচ্ছেন, কেউ কেউ আবার নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত।
শাকবাড়িয়া নদীর পাড়ে কথা হয় কাঁকড়াশিকারি জাহিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গতকাল রাতে সুন্দরবন থেকে এলাকায় ফিরিছি। ডাকাতির ভয়ে এবার খুব বেশি কাঁকড়া ধরতি পারিনি। আর্থিকভাবে সচ্ছল কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়া সুন্দরবনে যায় না। এখন নিষেধাজ্ঞার সময়, হাতে কোনো সঞ্চয় নেই। সংসার চালাতে ঋণ নিতি হবে।’
সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, মাছের চেয়ে লাভজনক হয়ে উঠেছে কাঁকড়ার ব্যবসা। জোড়শিং, ঘড়িলাল, বানিয়াখালী, দেউলিয়া বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন আড়তে প্রতিদিন কয়েক শ মণ কাঁকড়ার কেনাবেচা হয়। প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ব্যবসায়ীরা জেলেদের সুন্দরবনে কাঁকড়া শিকারের জন্য পাঠানোর কৌশল অব্যাহত রাখেন।
কয়রার এক কাঁকড়া ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বন্ধ আসলে কাগজে-কলমেই থাকে। ঘাটে ঘাটে কিছু টাকা দিয়ে সব পক্ষ সামলাতে হয়।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জলভাগ প্রায় ৩১ শতাংশ। এখানে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী আছে। সুন্দরবনের সম্পদ আহরণের জন্য ১২ হাজার নৌকার অনুমতিপত্র দেওয়া হয়, যার এক-তৃতীয়াংশ কাঁকড়া ধরার জন্য বরাদ্দ। প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া ধরার অনুমতি বন্ধ থাকলেও মাছ ধরার অনুমতি বহাল থাকে।
কাঁকড়া রক্ষা ও প্রজনন সম্পর্কে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, ‘জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মাসে কাঁকড়া ডিম পাড়ে। ডিমওয়ালা কাঁকড়ারা ক্ষুধার্ত থাকে, তাই সহজে ধরা যায়। এ সময় শিকার না করলে পরের বছর বেশি কাঁকড়া উৎপাদন সম্ভব। আমরা টহল জোরদার করেছি। কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে বন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পশ্চিম সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, কাঁকড়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্থানীয় জনগণ, জেলে ও ব্যবসায়ীদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।