কক্সবাজারের নাজিরারটেক বাজারে দোকানে বিক্রির জন্য রাখা শুঁটকি। গত বুধবার দুপুরে
কক্সবাজারের নাজিরারটেক বাজারে দোকানে বিক্রির জন্য রাখা শুঁটকি। গত বুধবার দুপুরে

কক্সবাজারে ৫ কোটি টাকার শুঁটকি নিয়ে কেন বিপাকে বিক্রেতারা

কক্সবাজারের নাজিরারটেকের শুঁটকির বাজারে দোকান আছে অন্তত ৪৫টি। দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ছুরি, লইট্যা, মাইট্যা, পোপা, সুরমাসহ নানা প্রজাতির শুঁটকি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বাজারে এখন কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকার শুঁটকি মজুত রয়েছে।

কিন্তু ক্রেতা নেই বললেই চলে। যে দোকানে আগে দিনে ৫০ হাজার টাকার শুঁটকি বিক্রি হতো, সেখানে এখন বিক্রি নেমেছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা করা অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

গত বুধবার দুপুরে নাজিরারটেকের শুঁটকির বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। ক্রেতা না থাকায় দোকানের কর্মচারীরা অলস সময় পার করছিলেন। কেউ বসে ছিলেন, কেউ গান শুনছিলেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরাই তাঁদের শুঁটকির অন্যতম প্রধান ক্রেতা। কিন্তু নাজিরারটেকে যাওয়ার সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা থাকায় পর্যটকেরা সেখানে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এর সঙ্গে সাগরে মাছের সংকট ও শুঁটকি উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায় মন্দা আরও বেড়েছে।

নাজিরারটেক সড়কের পশ্চিম পাশে ‘ফিশ মার্কেট’ নামের দোকানটিতে বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, লইট্যা ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, মাইট্যা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, পোপা ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, সুরমা ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, লাক্ষ্যা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা, চিংড়ি ৫০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, কামিলা ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট মাছের শুঁটকি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দোকানটির ব্যবস্থাপক মো. ফারুক (৩৮) প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দোকানে প্রায় সাত লাখ টাকার শুঁটকি মজুত আছে। কিন্তু বিক্রি খুব কম। আগে দিনে ৫০ হাজার টাকার শুঁটকি বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার। পর্যটক না এলে শুঁটকির বিক্রিও বাড়ে না।

পাশের ‘শুঁটকি মার্কেট’ নামের দোকানেও প্রায় ১২ লাখ টাকার শুঁটকি মজুত রয়েছে। দোকানটির মালিক মো. মজিবুর রহমান বলেন, বাজারে শুঁটকির সংকটের কথা বিবেচনা করে তিনি বিপুল পরিমাণ শুঁটকি সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পর্যটকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছেন না। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী তাঁর দোকান থেকে পাইকারিতে শুঁটকি কিনে শহরের বিভিন্ন দোকানে খুচরা বিক্রি করেন। এতে প্রতি কেজিতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যায়।

শুঁটকি প্লাস, শাহ জব্বারিয়া শুঁটকি বিতান, আল্লানদান শুঁটকি আড়ত, শুঁটকি মার্টসহ বাজারের আরও কয়েকটি দোকানেরও একই অবস্থা। প্রতিটি দোকানে ৭ থেকে ২০ লাখ টাকার শুঁটকি মজুত রয়েছে। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় বিক্রি হচ্ছে না। একটি দোকানের মালিক আজিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকঋণ নিয়ে শুঁটকি মজুত করেছিলেন। এখন বিক্রি না হওয়ায় ঋণ পরিশোধসহ ব্যবসার খরচ চালানো নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, নাজিরারটেকে পর্যটকদের যাতায়াতের অন্যতম বাধা সড়কের বেহাল অবস্থা। শহর থেকে নাজিরারটেকে যাওয়ার পথে সমিতিপাড়া, কুতুববাজার ও পশ্চিম কুতুবদিয়াপাড়া এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক ভাঙাচোরা। তাঁদের দাবি, ১৫ দিন আগেও কোনো কোনো দোকানে দিনে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি হতো। এখন তা কমে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় নেমেছে।

কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. শামীম আল ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভার তহবিল দিয়ে ওই সড়কের ভাঙা অংশ ঠিক করা সম্ভব না। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে জরিপ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থসহায়তা পেলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।

সড়কের পাশে ছুরি শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত এক শ্রমিক

৬০০ মহালে উৎপাদন বন্ধ

শুঁটকির বাজারে বিক্রি কমার পাশাপাশি উৎপাদনেও মন্দা চলছে। কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক উপকূলে ৬০০টির বেশি শুঁটকি মহালে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে সাগরে আশানুরূপ মাছ ধরা পড়ছে না। এর মধ্যে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার শুঁটকি শ্রমিক এবং ৬ হাজার ট্রলারের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার জেলে ও শ্রমিকের জীবিকা চাপে পড়েছে।

এলাকা ঘুরে তিনটি মহালে অল্প পরিমাণ ছুরি মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করতে দেখা যায়। শ্রমিকেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট থেকে এসব মাছ কিনে আনা হয়েছিল। পরে হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এখন সেগুলো রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হচ্ছে।

চালু থাকা মহালগুলোর একটি ‘রাশেদ শুঁটকি মহাল’। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ৬০টির বেশি বাঁশের মাচা খালি পড়ে আছে। মাত্র দুটি মাচায় কিছু মাছ শুকানো হচ্ছে। কাজ করছেন একজন নারী ও পাঁচজন শিশু-কিশোর। মহালটির মালিক মো. রাশেদ বলেন, আগে তাঁর মহালে ৪০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। এখন কাজ করছেন মাত্র কয়েকজন। পুরুষ শ্রমিকেরা দিনে ৮০০ টাকা এবং নারীরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পান। উৎপাদন বন্ধ থাকায় অধিকাংশ শ্রমিক বেকার।

নাজিরারটেকের শুঁটকিপল্লির অনেক শ্রমিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন সারা খাতুন (৪৫)। ২৫ বছর ধরে শুঁটকি মহালে কাজ করছেন তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পর চার মেয়েকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেন। বড় মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। এক মেয়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সন্তান নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছেন। মা-মেয়ে দুজন মিলে মহালে কাজ করে দিনে এক হাজার টাকা আয় করতেন।

কিন্তু চলতি অক্টোবর মাসে মা-মেয়ে মাত্র চার দিন কাজ পেয়েছেন। এতে তাঁদের মোট আয় হয়েছে চার হাজার টাকা। সারা খাতুন বলেন, এই টাকায় ১০ দিনের খাবারও জোটে না। কাজ না পেলে তাঁদের না খেয়ে থাকতে হয়।

পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, ভরা মৌসুমেও সাগরে মাছের সংকট এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে নাজিরারটেকের ৬০০টির বেশি মহাল বন্ধ রয়েছে। এতে ১২ হাজারের বেশি নারী শ্রমিকসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন। অন্যদিকে সমিতিপাড়া ও কুতুববাজার অংশের ভাঙাচোরা সড়কের কারণে পর্যটকেরা নাজিরারটেকের দোকানগুলোতে গিয়ে শুঁটকি কিনতে পারছেন না।

মহালে বেশির ভাগ মাচাং খালি। সামান্য কিছু মাছ শুঁটকি করা হচ্ছে

উৎপাদন কমছে, সামনে আরও সংকটের আশঙ্কা

কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, সাগরে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নাজিরারটেক, নুনিয়ারছটা, মগচিতাপাড়াসহ বিভিন্ন উপকূলে ৬০০টির বেশি মহালে শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত বছর মহালগুলোতে ৪০০ কোটি টাকার বেশি শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছে। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে শুঁটকি উৎপাদনে আরও ধস নামতে পারে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজারে ৩১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছে। আগের অর্থবছরের ১২ মাসে উৎপাদিত শুঁটকির পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সাগরে অতিরিক্ত মাছ আহরণসহ বিভিন্ন কারণে মাছের প্রাপ্যতা কমেছে বলে মনে করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা। তিনি বলেন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জরুরি। তবে মাছের সংকটের কারণে শুঁটকি উৎপাদন কমছে। কেন এই সংকট তৈরি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।