চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম কর্নার
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম কর্নার

চট্টগ্রাম

হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি কোনো উপজেলায়

চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। এই উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় আট হাজার শিশুকে হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা (প্রতি ডোজ) নির্ধারিত থাকে। ২০২৪ সালে উপজেলার প্রায় ৭ হাজার ৬০০ শিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৫ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে। অর্থাৎ টিকা দেওয়ার হার নেমে এসেছে প্রায় ৮৩ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কম।

শুধু সন্দ্বীপ নয়, গত বছর চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার কোনোটিতেই টিকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ১৫ উপজেলায় টিকার লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার। তবে টিকা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬২ শিশুকে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৯ শতাংশ। এর আগের বছর চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৯৭ শতাংশ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছর অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা থাকে। হামের টিকার প্রথম ডোজ শিশুর বয়স ৯ মাস হলে দেওয়া হয়।

গত বছর টিকাদানের কভারেজ কমে গিয়েছিল। ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সহকারীরা ৭ থেকে ৮ দফা কর্মবিরতি পালন করেন, যা টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জাহাঙ্গীর আলম, সিভিল সার্জন, চট্টগ্রাম জেলা

গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা পাঁচ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুর বয়স ৯ মাসের বেশি।

এদিকে জেলার ১৫ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও চট্টগ্রাম নগরে ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জানায়, ২০২৪ সালে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছিল লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু। সাড়ে ৯২ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় ডোজও নিয়েছিল। পরের বছর প্রথম ডোজ নিয়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ৯৫ শতাংশ শিশু।

কমেছে টিকার পরিধি

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, সম্প্রসারিত টিকা কার্যক্রমের (ইপিআই) মাধ্যমে গত বছর একটি উপজেলায়ও হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার কার্যক্রমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে টিকার কভারেজ (পরিধি) বেশি কমেছে ৭ উপজেলায়। সেগুলো হলো আনোয়ারা, বাঁশখালী, হাটহাজারী, মিরসরাই, সন্দ্বীপ, সাতকানিয়া ও সীতাকুণ্ড। এসব উপজেলায় প্রথম ডোজ কমেছে ৯ থেকে ১২ শতাংশ। অন্যদিকে দ্বিতীয় ডোজ কমেছে ৯ থেকে ১৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পেছনে স্বাস্থ্য সহকারীদের দীর্ঘ কর্মবিরতি, তদারকির ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা কাজ করেছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন দাবিতে স্বাস্থ্য সহকারীরা কয়েক দফায় কর্মবিরতি পালন করেন। এতে দীর্ঘ সময় মাঠপর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

টিকার পরিধি কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘গত বছর টিকাদানের কভারেজ কমে গিয়েছিল। ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সহকারীরা ৭ থেকে ৮ দফা কর্মবিরতি পালন করেন, যা টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে।’ তিনি বলেন, বর্তমানে জেলায় ১ লাখ ৯ হাজার ৬০৫ ডোজ টিকা মজুত রয়েছে।

সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, একটি শিশু তার মায়ের শরীরের ইমিউনিটির কারণে ৯ মাসের আগে হামে আক্রান্ত হবে না বা সুরক্ষা পাবে। এখন দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের আগের একাধিক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ৬০ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাস বা এর কম।

বয়সের আগে ‘আক্রান্ত’ শিশুরা

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ১২ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৪ শিশুর। হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন। গত ২৮ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ৮৭ শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়েছে। উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে দুই শিশু।

দেশে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে। সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, একটি শিশু তার মায়ের শরীরের ইমিউনিটির কারণে ৯ মাসের আগে হামে আক্রান্ত হবে না বা সুরক্ষা পাবে। এখন দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের আগের একাধিক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ৬০ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাস বা এর কম।

এ বিষয়ে বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জাফরিন জাহেদ বলেন, ‘জন্মের পর শিশুরা বুকের দুধ থেকে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি পেয়ে থাকে। আমরা ধারণা করছি, মায়ের কাছ থেকে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা না পাওয়ার কারণেই টিকার সময়ের আগে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।’

জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কেন্দ্রের সদস্যসচিব চিকিৎসক সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, ‘জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে হামের মতো সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। একটি বয়সের পর টিকা লাগে।’ তিনি বলেন, করোনার পর বৈশ্বিক টিকা সহায়তা কমে যাওয়ার সঙ্গে দেশে টিকাদানে গুরুত্ব ও বিনিয়োগ কমায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখন হামের বাড়তি সংক্রমণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।