ঝুড়িভর্তি আম বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন চাষিরা। গতকাল শুক্রবার সকালে নওগাঁর সাপাহার আমবাজারে
ঝুড়িভর্তি আম বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন চাষিরা। গতকাল শুক্রবার সকালে নওগাঁর সাপাহার আমবাজারে

সাপাহার আমবাজারে নাকফজলি, গোপালভোগ ও হিমসাগর, এবার কত টাকার ব্যবসা হতে পারে

দেশের অন্যতম আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁর সবচেয়ে বড় আমবাজার সাপাহার কয়েক দিন আগেও ছিল প্রায় আমশূন্য। তবে মৌসুমের প্রধান প্রধান জাতের আম বাজারে উঠতে শুরু করায় এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরব হয়ে উঠছে বাজারটি। ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার আম–বাণিজ্য হতে পারে।

প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২২ মে গুটি বা আঁটির আম এবং ৩০ মে গোপালভোগ আম বাজারে আসতে শুরু করে। গত সোমবার থেকে পাওয়া যাচ্ছে হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি। আর গতকাল শুক্রবার থেকে বাজারে উঠেছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত নওগাঁর নাকফজলি আম।

বাজারের হালচাল

গতকাল সকাল ১০টার দিকে সাপাহার আমবাজারে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা সদরের জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে সাপাহার-নজিপুর সড়কের পাশে ভ্যানভর্তি আম নিয়ে বিক্রির অপেক্ষায় আছেন চাষিরা। জিরো পয়েন্ট থেকে মডেল মসজিদ কমপ্লেক্স পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে সড়কের দুই পাশে বসেছে অর্ধশতাধিক আমের আড়ত। দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পর এসব আড়তে আম বিক্রি করছেন চাষিরা।

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার দিবর গ্রামের আমচাষি সোহেল হোসেন দুটি ভ্যানে করে আট মণ নাকফজলি আম নিয়ে এসেছেন বাজারে। তিনি বলেন, কয়েকজন আড়তদার তাঁর আমের দাম করেছেন। সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ টাকা মণ দাম উঠেছে। আরও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দাম পেলে আম বিক্রি করবেন। তাঁর ভাষ্য, গত বছর একই সময়ে নাকফজলি আম প্রতি মণ ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সে তুলনায় এবার দাম কম।

সোহেলের মতো আরও অনেক চাষি নাকফজলি, গোপালভোগ ও হিমসাগর আম নিয়ে বিক্রির অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, এবার দাম তুলনামূলক কম। পাশাপাশি প্রশাসনের মধ্যস্থতায় চাষি ও আড়তদারদের সমঝোতার ভিত্তিতে ৪৮ কেজিকে এক মণ ধরে আম বিক্রি করতে হচ্ছে, যা নিয়েও অসন্তোষ আছে।

আম দেখছেন কয়েকজন ক্রেতা

পোরশা উপজেলার শিবপুর এলাকার চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, ১ হাজার ৫৬০ টাকা মণ দরে চার মণ হিমসাগর আম বিক্রি করেছেন। গতবারের তুলনায় এবার দাম কম। এর ওপর প্রতি মণে আট কেজি অতিরিক্ত ওজন নেওয়া হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরাই।

সাপাহার আমবাজারে ২৩০টি আড়ত বসেছে জানিয়ে আড়তদার সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা বলেন, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের অধিকাংশ আমবাজারেই ‘ঢলতা’ (অতিরিক্ত ওজন) হিসেবে প্রতি মণে আট কেজি অতিরিক্ত আম নেওয়া হয়। কাঁচামাল সব সময় কিছু নষ্ট হয়। এ জন্য তাঁরা ক্রেটসহ ৪৮ কেজিতে মণ হিসেবে আম কিনছেন। তাঁরা নিজেরা পাইকারদের কাছে ৪৫ কেজিতে মণ দরে আম বিক্রি করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ মণ আম উঠছে। ল্যাংড়া ও আম্রপালি আম বাজারে এলে প্রতিদিন ২০–৩০ হাজার মণ আমের বেচাকেনা হবে, তখন দম ফেলার সময় থাকবে না।

এ বিষয়ে সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা রিয়াজ বলেন, কৃষিপণ্য ৪০ কেজিকে এক মণ ধরে বেচাকেনার বিষয়ে সম্প্রতি পরিপত্র জারি হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার কোনো অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী, আড়তদার ও চাষিদের সঙ্গে সভা করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালানো হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোন আম কবে আসবে

প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও হাঁড়িভাঙা, ১৫ জুন আম্রপালি, ২৫ জুন ফজলি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো এবং ৫ জুলাই থেকে আশ্বিনা, বারি আম-৪, গৌড়মতি ও কাটিনা আম বাজারজাত করা যাবে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১২ দশমিক ৭৮ টন উৎপাদনের হিসাবে মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৬১ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০ টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যও রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, দেশের মধ্যে এবার নওগাঁয় সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। মৌসুমজুড়ে ঝড়ঝাপটা ও রোগবালাই তুলনামূলক কম থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এ বছর জেলায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার আম–বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে।