নোয়াখালীর সুবর্ণচরে মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করা তরমুজ খেতজুড়ে পোকা দমনে বসানো হয়েছে হলুদ ও নীল রঙের আঠাযুক্ত প্লাস্টিক। গত মঙ্গলবার দুপুরে চর জুবলী ইউনিয়নের চর কচ্ছপিয়া এলাকায়
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করা তরমুজ খেতজুড়ে পোকা দমনে বসানো হয়েছে হলুদ ও নীল রঙের আঠাযুক্ত প্লাস্টিক। গত মঙ্গলবার দুপুরে চর জুবলী ইউনিয়নের চর কচ্ছপিয়া এলাকায়

নোয়াখালীর সুবর্ণচর

‘মালচিং’ পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে বদলে গেছে ফলন

দ্বিগুণ ফলনের আশা করছেন কৃষকেরা। নতুন প্রযুক্তিতে বাড়ছে লাভ, কমছে পোকামাকড়ের আক্রমণ পানির ব্যবহার।

‘আগে তরমুজ চাষ করে লাভ হতো না, এবার নতুন পদ্ধতিতে চাষ করেছি। এতে খরচ কমেছে। ফলনও বেশি হয়েছে।’ কথাগুলো বলছিলেন আবুল হাশেম। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর জুবলী ইউনিয়নের উত্তর কচ্ছপিয়া গ্রামের কৃষক।

আবুল হাশেম প্রায় এক দশক ধরে তরমুজ চাষ করেন। কখনো নিজের জমিতে, কখনো কারও জমি বর্গা নিয়ে। শুরুতে ভালো ফলন ও লাভ পেলেও কয়েক বছর ধরে তাঁর লোকসান হচ্ছিল। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। এবার তাই পরীক্ষামূলকভাবে ‘মালচিং’ পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ শুরু করেন।

মালচিং পদ্ধতি হলো মাটিতে পচনশীল একধরনের পলিথিন দিয়ে চাষের বেড ঢেকে দেওয়া। আর মালচিং কাগজ হলো একধরনের কাগজ, যার এক পাশে কালো ও অন্য পাশে রুপালি রং করা থাকে। কালো পাশ নিচে ও রুপালি পাশ ওপরের দিকে দিয়ে মাটি ঢেকে দিতে হয়। এভাবে মাটি ঢেকে দেওয়ার ফলে কালো রঙের প্রভাবে প্রচণ্ড সূর্যের তাপেও মাটির আর্দ্রতা শুকিয়ে যায় না। এ কারণে মাটিতে পানির পরিমাণ কম লাগে। অন্যদিকে মাটি ঢেকে থাকায় আগাছা হয় না। রুপালি পাশ ওপরে থাকায় পোকামাকড়ের উপদ্রবও তুলনামূলক কম হয়।

আবুল হাশেম বলেন, মালচিংয়ের পাশাপাশি তিনি ব্যবহার করেছেন ফেরোমন ফাঁদ ও আঠাযুক্ত প্লাস্টিক ফাঁদ। ফেরোমন ফাঁদে স্ত্রী মাছি পোকার গন্ধ ব্যবহার করে পুরুষ পোকা ধরা হয়। আর আঠাযুক্ত প্লাস্টিকে ক্ষতিকর পোকা আটকে যায়। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ  অনেক কমেছে। এ কারণে ফলনও বেড়েছে সনাতন পদ্ধতির তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।

অবশ্য শুধু আবুল হাশেম নন, তাঁর মতো সুবর্ণচরের অনেকেই মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করেছেন। কৃষকেরা জানান, এই পদ্ধতিতে শ্রমিক ও কীটনাশক খরচ কম, সেচের পানিও কম লাগে। এমনকি লবণাক্ততা নিয়েও তেমন দুশ্চিন্তা করতে হয় না। এ কারণে ফলন খুব ভালো হয়। 

সম্প্রতি আবুল হাশেমের তরমুজখেতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় চার একর জমিজুড়ে তাঁর তরমুজের খেত। পুরো জমি মালচিং পেপার দিয়ে ঢাকা। খেতজুড়ে বসানো হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ ও আঠাযুক্ত প্লাস্টিক।

কৃষকদের সনাতন পদ্ধতি থেকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সরকারি উদ্যোগে ৩৮টি প্রদর্শনী প্লটে মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে।
মো. হারুন অর রশিদ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা

একই এলাকার কৃষক মোজাম্মেল হকও মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করেছেন। এবার তিনি দুটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করেছেন। এতেই তাঁর কপাল খুলেছে। তাঁর পাশের জমিতে প্রতিবেশী এক কৃষক সনাতন পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে পুঁজি তুলতে কষ্ট হয়েছে। আর তাঁর খেতে যে ফলন হয়েছে, তাতে খরচের দ্বিগুণের বেশি লাভ হবে বলে আশা করছেন। 

চর জুবলীর আরেক কৃষক আমির হোসেন বলেন, গত চার বছর তরমুজ চাষ করলেও সব সময় লাভ হয়নি। তবে পাশের খেতে মালচিং পদ্ধতিতে ভালো ফলন দেখে তিনিও আগ্রহী হয়েছেন। আগামী বছরে তিনিও এ পদ্ধতিতে চাষ করবেন। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, এবার সুবর্ণচরে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২০০ হেক্টর বেশি। কৃষকদের সনাতন পদ্ধতি থেকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সরকারি উদ্যোগে ৩৮টি প্রদর্শনী প্লটে মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। এতে পচনশীল মালচিং পেপার, ফেরোমন ফাঁদ ও আঠাযুক্ত ফাঁদের ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায়ও অনেক কৃষক এবার এই পদ্ধতিতে চাষ করে লাভবান হয়েছেন।