মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কামালপুর বাজারে সিপিবি প্রার্থী জহর লাল দত্তের জনসংযোগ।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কামালপুর বাজারে সিপিবি প্রার্থী  জহর লাল দত্তের জনসংযোগ।

পরিচিত প্রতীকের ভিড়ে অনেকটা নীরবে চলছে জহর লাল দত্তের ‘কাস্তে’র প্রচারণা

দিনের অন্য সময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়, নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা-আলাপ হয়। কিন্তু মূলত নির্বাচনী প্রচারণাটা শুরু হয় তাঁর নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময় ধরেই। বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ করছেন। হাটবাজারে পথসভার মাধ্যমে কাস্তে প্রতীকের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন জহর লাল দত্ত।

মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসন থেকে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জহর লাল দত্ত। তিনি গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট–সমর্থিত ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের জগৎসী এলাকাতে জনসংযোগ করেন এই প্রার্থী। পরিচিত চেনাজানা প্রতীকের ভিড়ে অনেকটা নীরবে চলছে কাস্তের প্রচারণা।

প্রার্থী, সমর্থক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সকাল-বিকেল মানুষের মধ্যে প্রার্থিতা জানিয়ে জহর লাল দত্ত প্রচারপত্র বিলি শুরু করেন। প্রতীক বরাদ্দের পর জনসংযোগে নিয়মিত হয়েছেন। এখন নিয়ম করে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময় ধরেই চলছে তাঁর প্রচার-প্রচারণা। বেলা দুইটা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তিনি আসনের কোনো না কোনো এলাকার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। এই একটিমাত্র অটোরিকশা দিয়েই রাজনগর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম ও হাটবাজারে চলছে তাঁর জনসংযোগ। কখনো একা, কখনো দু–চারজন কর্মী-সমর্থক সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঘরে সরাসরি ভোটারের সঙ্গে কথা বলছেন, ভোটারের হাতে প্রচারপত্র তুলে দিচ্ছেন। কখনো হাটবাজারে গিয়ে পথসভা করছেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে দলের স্থানীয় নেতারাসহ শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নিচ্ছেন। তাঁর এই প্রচারণায় চেনাজানা অন্য সব প্রতীকের ভিড়ে কাস্তে নতুন করে পরিচিত হয়ে উঠছে। এই প্রচারণা চলে রাত আটটা পর্যন্ত। একদিন সদর উপজেলায় মাইকিং করলে, অপর দিন রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলে মাইকিং।

জহর লাল দত্ত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আমার সাধ্যানুযায়ী সরাসরি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ করছি। আমাদের পার্টির অত লোকবল নেই। তারপরও লোকবলের তুলনায় অনেক বেশি প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আমার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে প্রচারণায় হতদরিদ্র মানুষ অংশ নিচ্ছেন।’

জহর লাল দত্ত জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল, নাজিরাবাদ, কাগাবলা, গিয়াসনগর, কনকপুর, কামালপুর, আখাইলকুরা, খলিলপুর, চাঁদনীঘাট, একাটুনা এবং পৌরসভার আংশিক এলাকায় প্রচারণা চালানো হয়েছে। শিগগিরই পৌরসভা এলাকায় দলীয় নেতা-কর্মীসহ কাপড়ের তৈরি ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে প্রচারণা চালানো হবে। অপর দিকে রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর ও কামারচাক ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে প্রচারণা চালানো হয়েছে। তবে রাজনগরের ইন্দেশ্বর, করিমপুর, আমেনা, রাজনগর, মাথিউরা, উত্তরভাগসহ সাতটি চা-বাগানে প্রচারণা চালানো হয়েছে। সদর উপজেলার হামিদিয়া ও মৌলভী চা-বাগানেও জনসংযোগ করেছেন। এই আসনের দুটি উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে এ পর্যন্ত অন্তত ৪০টি পথসভা করা হয়েছে।

জহর লাল দত্ত বলেন, ‘মানুষ আমাকে কত ভোট দিবে, না দিবে, সেটা ভিন্ন কথা। এ নিয়ে তেমন ভাবছি না। মানুষ আগ্রহ নিয়ে আমাদের কথা শুনছে। আমাদের প্রতীকটাকে চিনছে। আমরা দুঃশাসন হটানো, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে বিকল্পধারা তৈরি, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন, শোষণবঞ্চনা থেকে মানুষকে মুক্ত করা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার কথা বলছি।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে এই দাবিদাওয়া নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন করছি। আমাদের নির্বাচন এই ধারাবাহিক আন্দোলনেরই একটি অংশ। আমাদের এই কাস্তে শুধু একটা প্রতীক না, কৃষক-শ্রমিকের ঘামমেশা শোষণ ভাঙার হাতিয়ার।’

এ আসনে একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী জহর লাল দত্ত জানিয়েছেন, তাঁর প্রার্থিতার কারণে অনেকে (সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের) তাঁকে বলেছেন, এতে তাঁরা সাহস পেয়েছেন। শক্তি অনুভব করছেন। তবে এ পর্যন্ত ছোট দলের বা সংখ্যালঘু প্রার্থী হওয়ায় কোথাও কোনো বাধার সম্মুখীন হননি। যে স্থানেই প্রচারণায় যাচ্ছেন, মানুষের কাছ থেকে একধরনের সাড়া পাচ্ছেন।

জহর লাল দত্ত সিপিবি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। ৪০ বছর ধরে সিপিবির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়ভাবে কৃষক-খেতমজুরদের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে সক্রিয় আছেন। এই নির্বাচনও সেই আন্দোলনেরই একটি অংশ। তিনি জানান, নির্বাচনের খরচ জোগান দিচ্ছে তাঁর দল সিপিবি, বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীরা। তিনি নিজেও সামর্থ্যমতো খরচ করছেন। এ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। আপাতত কোনো সমস্যা দেখছেন না। প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর বিভিন্ন দপ্তর থেকে নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন কি না জানতে চাওয়া হচ্ছে।

মৌলভীবাজার-৩ আসনে তিনিসহ চারজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যরা হচ্ছেন বিএনপির নাসের রহমান, জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুল মান্নান এবং খেলাফত মজলিসের আহমদ বিলাল। এ আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৩১ ও নারী ভোটার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭ জন। এ আসনে ৬ হাজার ৭৫১ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন।

জহর লাল দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় মানুষ নির্ধারণ করবে। তবে আমি আশাবাদী, মানুষ আমাকে ভোট দেবে।’