
বরিশালে শুষ্ক মৌসুমে মশার অস্বাভাবিক বিস্তারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জীবন। এত দিন সীমিত পরিসরে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও তেমন সুফল আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে মশার দাপট কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। আজ রোববার নগরজুড়ে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করেছে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ। এ লক্ষ্যে ১২টি জরুরি দল গঠন করে সকাল-বিকাল নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হবে।
নগর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রাকৃতিক কারণে নদী, খাল ও বিলের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ জন্য আগের তুলনায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই নগরের ৩০টি ওয়ার্ডের প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় খাল-বিল, নালা ও আবাসিক এলাকায় একযোগে এ বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।
মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী বলেন, ৩০টি ফগার মেশিন দিয়ে দিনে তিনটি করে মোট ছয়টি ওয়ার্ডে উড়ন্ত মশা দমনে ওষুধ ছিটানো হবে। পাশাপাশি জলাশয়সংলগ্ন স্থানে মশার ডিম ধ্বংস করতে লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জন্য প্রতিদিন অন্তত ২২০ লিটার ওষুধ প্রয়োগ করা হবে।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ২০০ লিটার অ্যাডাল্টিসাইড (বড় মশা মারার ওষুধ) এবং তিনটি ওয়ার্ডে ২০ লিটার লার্ভিসাইড (লার্ভা ধ্বংসের ওষুধ) ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে চারপাশে মশা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ থাকায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়ছে। তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরিশাল অঞ্চলে কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেড়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তৎপরতা আগের তুলনায় বাড়ানো হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ফগার মেশিন হাতে মশকনিধনকর্মীরা বিভিন্ন এলাকার ঝোপ ও বদ্ধ নালায় ওষুধ ছিটালেও এসব কোনো কাজে আসছে না।
আজ সরেজমিনে ২৬, ২৭ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে মশকনিধনের কাজ চলতে দেখা যায়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ওয়ার্ডেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন অভিযানে অংশ নেওয়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
নগরের আমির কুটির এলাকার বাসিন্দা কুট্টি বেগম বলেন, ‘দিনে-রাতে ঘরে থাকা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এত মশা যে এখন অসহ্য অবস্থা আমাদের। মশার ওষুধ দিলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না।’ রূপাতলী এলাকার বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক বলেন, নগরজুড়ে সবখানেই বহুতল ভবন তৈরির হিড়িক চলছে। এসব নির্মাণাধীন ভবন এখন মশা উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নগরে আগে ২২টি খাল প্রবহমান ছিল। এসব খালের দু-তিনটি ক্ষীণধারায় সচল আছে। বাকিগুলো অস্তিত্বহীন। এসব খাল উদ্ধার করে প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এবং নালার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করতে না পারলে মশকনিধনের যেকোনো কার্যক্রম সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বরিশাল নগরসহ সর্বত্র পাঁচ বছর ধরে ব্যাপক হারে ডেঙ্গুর প্রকোপ লেগে থাকছে সারা বছর। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর বরিশাল নগরসহ বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন ২১ হাজার ৮১৫ রোগী। মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। তার আগের বছর আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজার ৪৫৭ রোগী। মারা গিয়েছিলেন ৫৮ জন। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২৫১ জন।
সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মনজুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মশার বিস্তার রোধে ১২টি জরুরি দলে মোট ৫২ সদস্য কাজ করছেন। তিনি বলেন, একই ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। তাই নতুন ভ্যারাইটির ওষুধ প্রয়োগ শুরু হয়েছে।