
সকাল ১০টায় ওয়ার্কশপ খুলি। বন্ধ করি সাতটায়। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। দোকানে তিনজন কর্মচারী কাজ করেন। তাঁদের দৈনিক তিন হাজার টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক খরচ তো রয়েছেই। তবে দিন শেষে তিন হাজার টাকার কাজও হয় না। লস টানতে টানতে অবস্থা কাহিল।’
কথাগুলো বলছিলেন নোয়াখালী শহরের লক্ষ্মীনারায়ণপুরের বাসিন্দা মো. বাবলু। জেলা শহর মাইজদীর কলেজ রোডের খলিল মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে তাঁর ছোট একটি কারখানা রয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিনই তাঁর লোকসান গুনতে হচ্ছে।
‘বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে সন্তানদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারা আর পড়ার টেবিলে বসতে চায় না।’সুলতানা রাজিয়া, গৃহিণী, ইসলামিয়া রোড, নোয়াখালী এলাকার বাসিন্দা
বাবলুর মতো একই দুর্ভোগ মো. নয়ন হোসেনের। তাঁর নোয়াখালীর সেনবাগে নয়ন স্টিল অ্যান্ড ওয়েল্ডিং কারখানা নামে একটি ওয়ার্কশপ রয়েছে। এ ওয়ার্কশপে কর্মচারী রয়েছেন ২৭ জন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা দিন বিদ্যুৎ আসে আর যায়। এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং। সন্ধ্যা সাতটা বাজতেই প্রশাসনের চাপে কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়। এই পরিস্থিতিতে কারখানার কর্মচারীদের বেতন কীভাবে দেব, কীভাবে ঘরের ভাড়া দেব, এ চিন্তায় আসে না।’
অবশ্য শুধু বাবলু ও নয়ন নয়। লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি নোয়াখালীর জেলাজুড়েই। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম, দিন–রাত সমানতালে সব জায়গায় লোডশেডিং চলে। এতে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়ালেখাও বিঘ্ন ঘটছে। শহরের ইসলামিয়া রোড এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী সুলতানা রাজিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘দিন যত যাচ্ছে লোডশেডিং তত বাড়ছে। বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে সন্তানদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারাও আর পড়ার টেবিলে বসতে চায় না।’
তবে গ্রামীণ এলাকায় বাস্তব পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। সেনবাগ উপজেলার খাজুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জামাল হোসেন বলেন, ‘শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্কুলে ছিলাম, এর মধ্যে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেয়েছি। একবার গেলে এক ঘণ্টার আগে আসে না, আবার এলেও আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়। তীব্র গরমে শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছে।’
জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী দুই সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। জানতে চাইলে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুল বাহার বলেন, মাইজদী ও দত্তেরহাট সাবস্টেশনের আওতায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ৩২ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১ থেকে ১৪ মেগাওয়াট। সন্ধ্যার পর চাহিদা বেড়ে ৩৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ থাকে প্রায় ১৭ মেগাওয়াট। ফলে রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে, এতে প্রতিটি ফিডার লাইনে দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
একই কথা বলেন নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (কারিগরি) মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, সমিতির অধীন ৯টি উপজেলায় ‘পিক আওয়ারে’ বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২১০ মেগাওয়াট এবং ‘অফ পিক’ সময়ে ১৫০ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ফলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়।