কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

এক্স-রে যন্ত্র অচল ২ বছর, চালক নেই অ্যাম্বুলেন্সের

৪৩ জন চিকিৎসকের পদ আছে। বর্তমানে চিকিৎসক আছেন ২৪ জন। ১৯ জন চিকিৎসকের পদ খালি।

যশোরের কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই বছর ধরে এক্স-রে যন্ত্র অচল হয়ে পড়ে আছে। একটি সচল অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক নেই চার বছর ধরে। আছে ওষুধ ও চিকিৎসকের সংকটও। নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

৫০ শয্যার কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাতক্ষীরার তালা ও কলারোয়া, খুলনার ডুমুরিয়া এবং যশোরের মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার রোগীরাও চিকিৎসা নিতে আসেন। এ হাসপাতাল খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তে।

কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, এখানে চিকিৎসকের পদ আছে ৪৩টি। বর্তমানে চিকিৎসক আছেন ২৪ জন। ১৯ জন চিকিৎসকের পদ খালি। এর মধ্যে অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজি, চক্ষু, চর্ম ও সার্জারি বিভাগের ৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ১৪ জন সাধারণ চিকিৎসকের পদ শূন্য। এ ছাড়া ১১৮ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও আছেন ৭৭ জন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে ২৩ জন থাকার কথা থাকলেও আছেন ১৪ জন। সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়ে। পদ আছে পাঁচজনের। আছেন মাত্র একজন।

রোজিনা খাতুনের বাড়ি কেশবপুর উপজেলা সাবদিয়া গ্রামে। তিনি তাঁর ৪১ দিনের শিশুর ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে ২৪ আগস্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন। রোজিনা জানান, শিশুসন্তানকে চিকিৎসা দিয়ে একটি ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়, কিন্তু ওষুধ দেওয়া হয়নি। ১৫ দিন আগেও হাসপাতালে এসেছিলেন, তখনো ওষুধ পাননি।

ঊর্মি খাতুন তাঁর দুই বছরের মেয়ের বমি ও বুকে ব্যথা নিয়ে এসেছিলেন হাসপাতালে। তাঁর বাড়ি উপজেলার বায়সা গ্রাম। আক্ষেপ করে ঊর্মি বলেন, এত বড় একটা হাসপাতালে যদি সরকারি ওষুধই না পাওয়া যায়, তাহলে কী ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে?

২৪ আগস্ট সরেজমিনে কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা গেছে, রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রত্যেক চিকিৎসকের কক্ষের সামনেই রোগীদের দীর্ঘ সারি। এদিন অন্তর্বিভাগে ৮২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। বহির্বিভাগে ৬৪৩ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নেন।

৭০ বছর বয়সী ভানু বিবি বার্ধক্যজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁকে চিকিৎসক বুকের এক্স-রে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করতে বলেন। রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা হাসপাতালে হলেও এক্স-রে যন্ত্র অচল থাকায় তাঁকে বাইরে থেকে ৪৫০ টাকা দিয়ে তা করতে হয়েছে। ভানু বিবির স্বজন আব্দুল খালেক বলেন, হাসপাতালে এক্স-রে করতে পারলে ২২০ টাকায় হয়ে যেত। বাইরে থেকে বেশি টাকা দিয়ে এক্স-রে করাতে হয়েছে।

কেশবপুর শহরের বাসিন্দা খালিদুর রহমান। ২১ আগস্ট তাঁর ভাগনি অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি ভিত্তিতে তাকে খুলনায় নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে তাঁদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ২ হাজার ২০০ টাকায় খুলনায় যেতে হয়। খালিদুর রহমান বলেন, খুলনায় যেতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ফি ১ হাজার ২০ টাকা। কিন্তু দ্বিগুণ টাকা দিয়ে তাঁদের খুলনায় যেতে হয়েছে।

কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রেহেনেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, চালক না পাওয়ার কারণে অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবাটি সঠিকভাবে দেওয়া যাচ্ছে না। তাঁর গাড়ির চালক দিয়ে মাঝেমধ্যে রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। দুই বছর ধরে এক্স-রে মেশিনটি নষ্ট হওয়ার বিষয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছেন। আর অর্থবছর শেষ হওয়ায় অনেক ওষুধই ফুরিয়ে গেছে, নতুন করে আবারও ওষুধ কেনা হলে চাহিদামতো ওষুধ দেওয়া সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, এখানে গড়ে প্রতিদিন ৪৫০ রোগী বহির্বিভাগে এবং অন্তর্বিভাগে প্রায় ১০০ রোগী চিকিৎসা নেন। শয্যার বেশি রোগী ভর্তি থাকায় মেঝেতে ঠাঁই নিতে হয় রোগীদের।

চালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। ওষুধের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া হয়ে গেলে ওষুধসংকট কমে যাবে। আর নতুন এক্স-রে মেশিন ক্রয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
মো. মাসুদ রানা, যশোরের সিভিল সার্জন

হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের চালক অনেক জায়গায়ই নেই উল্লেখ করে যশোরের সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানা বলেন, চালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। ওষুধের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া হয়ে গেলে ওষুধসংকট কমে যাবে। আর নতুন এক্স-রে মেশিন ক্রয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন কেশবপুর নাগরিক সমাজের সভাপতি আবুবক্কার সিদ্দিকী বলেন, নানা সংকটের রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার দাবি জানাচ্ছেন তিনি।