দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পারভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম সংশোধনের জন্য পরামর্শ নিতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। ২০ অক্টোবর ২০২৬
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পারভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম সংশোধনের জন্য পরামর্শ নিতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। ২০ অক্টোবর ২০২৬

জন্মসনদে সৎমায়ের নাম, আপন মায়ের সম্পত্তি পেতে ভোগান্তি

মায়ের মৃত্যুর পর রাজধানী ঢাকায় একটি চাকরি নেন ইয়াকুব আলী। চাকরির জন্য প্রয়োজন হয় জন্মসনদের। আপন মায়ের নামের জায়গায় সৎমায়ের নাম বসিয়ে জন্মসনদ তৈরি করে দেন বাবা আজগর আলী। পরে জন্মসনদ অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি হয়। কাগজে–কলমে সৎমায়ের সন্তান হিসেবে ইয়াকুবের কেটে যাচ্ছে প্রায় দেড় যুগ।

তবে বিপত্তি বেধেছে আপন মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার ঘিরে। আপন ভাইসহ বাকি উত্তরসূরিরা তাঁর মৃত মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ পেলেও মায়ের নামের বিড়ম্বনায় ইয়াকুব পড়েছেন ভোগান্তিতে। নিজেকে আপন মায়ের সন্তান প্রমাণ করতে চার বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন বর্তমানে কৃষিশ্রমিকের কাজ করা ইয়াকুব।

ইয়াকুবের বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা ১ নং মুকুন্দপুর ইউনিয়নের পারভবানীপুরের বালুপাড়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আজগর আলী ও মৃত আয়েশা বেগম দম্পতির ছেলে। জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ইয়াকুবের জন্ম ১৯৯২ সালে ১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৮ সালে মা আয়েশা বেগম তাঁর বড় ছেলে আইয়ুব আলী, মেজ ছেলে ইয়াকুব আলী ও ছোট ছেলে ইউসুফ আলীকে রেখে মারা যান।

ইয়াকুব আলী তাঁর মায়ের নাম সংশোধনের জন্য যে আবেদন করেছেন, সেটি ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। এটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক দেখেন। এই সমস্যা সমাধান উপজেলা কার্যালয়ে সম্ভব নয়। তবে মহাপরিচালক চাইলে এ বিষয়ে একটি তদন্ত দিতে পারেন। তখন আমি তদন্ত করব, প্রতিবেদন পাঠাব।
—আবদুল হাকিম মণ্ডল, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, বিরামপুর, দিনাজপুর

ইয়াকুব ও তাঁর পরিবারের ভাষ্য, ১৯৯৮ সালে আয়েশা বেগমের মৃত্যুর পর আজগর আলী মোছা. রেজিনাকে বিয়ে করেন। ২০০৯ সালে ইয়াকুব গার্মেন্টেসে চাকরির জন্য ঢাকায় গেলে জন্মসনদের প্রয়োজন হয়। তখন তাঁর বাবা আজগর আলী ছেলে ইয়াকুবের আপন মায়ের পরিবর্তে সৎমা মোছা. রেজিনার নাম বসিয়ে নতুন জন্মসনদ তৈরি করেন। পরে সেই জন্মসনদ অনুযায়ী ২০১৫ সালে ইয়াকুবের নামে ইস্যুকৃত জাতীয় পরিচয়পত্রেও তাঁর মায়ের নাম মোছা. রেজিনা থেকে যায়।

ইয়াকুব জানান, ২০১৬ সালে সৎমায়ের নামের জায়গায় আপন মা আয়েশা বেগমের নাম দিয়ে সংশোধিত জন্মসনদ করে নেন তিনি। আপন মা আয়েশা বেগমের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ ওয়ারিশ সূত্রে মৌখিকভাবে ভোগদখলের সুযোগ পেলেও সেই জমির নিজের নামে খাজনা দিতে, খারিজ ও বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন তিনি।

ইয়াকুবের ভাষ্য, তাঁর মা আয়েশা বেগম পৈতৃকসূত্রে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি রেখে মারা যান। ইয়াকুবের জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে সৎমায়ের নাম দিলে স্বামী (আজগর আলী) উত্তরাধিকার সূত্রে স্ত্রী আয়েশা বেগমের রেখে যাওয়া সম্পত্তি তুলনামূলক বেশি পাবেন—এই ভাবনা থেকে সৎমা রেজিনা তাঁর সৎছেলে ইয়াকুবের জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর নাম দেওয়ার পরামর্শ দেন স্বামীকে। আর ২০১২ সালে ইয়াকুব আলীর ছোট ভাই ইউসুফ আলী মারা যাওয়ার পর জমির ভাগ বেশি পাওয়ার পথটি আরও পরিষ্কার হয়।

সম্পত্তির ভাগ পাওয়ার আশায় ইয়াকুবের আপন মায়ের নামের পরিবর্তে তাঁর নাম দেওয়ার বিষয়ে সৎমা রেজিনা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে সৎমা ও বাবার বিরুদ্ধে ইয়াকুবের করা অভিযোগ তাঁর বাবা আজগর আলী অস্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি (যখন মায়ের নাম পরিবর্তন) করিছি, তখন ওর মা আছিল না। আমি জানি না, ওটা কীভাবে ওখানে (ইউনিয়ন পরিষদ) করিছে। ছেলেটার যে মা বেঁচে আছে, ওই মায়ের (সৎমা) নাম তুলে দিয়ে ওটা (জন্মসনদ) করিছে। আমি ওটা করলে ওর আসল (আপন) মায়ের নামই দিতাম।’

ঢাকার চাকরিরত অবস্থায় বিয়ে করেন ইয়াকুব। পরে ২০২১ সালে চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। ২০২৩ সালে জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর আপন মা আয়েশা বেগমের নাম সংযোজন করতে বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন করেন ইয়াকুব। সে বছর তাঁর ওই আবেদন বাতিল হয়। পরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আবেদন করলে সেটিও বাতিল হয়। সর্বশেষ ২০ অক্টোবর আপন মা আয়েশা বেগমের সন্তান প্রমাণ করতে নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী সব নথিপত্রসহ আবার অনলাইনে আবেদন করেন ইয়াকুব।

জানতে চাইলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল হাকিম মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইয়াকুব আলী তাঁর মায়ের নাম সংশোধনের জন্য যে আবেদন করেছেন, সেটি “ঘ” ক্যাটাগরিতে পড়েছে। এটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক দেখেন। এই সমস্যা সমাধান উপজেলা কার্যালয়ে সম্ভব নয়। তবে মহাপরিচালক চাইলে এ বিষয়ে একটি তদন্ত দিতে পারেন। তখন আমি তদন্ত করব, প্রতিবেদন পাঠাব।’