
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের একটি বাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাফায়াত হোসেন (১৭) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়। দুপুরে মারা যান সামির আহামেদ (৪০) নামের আরেকজন। এর আগে গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকায় নেওয়ার সময় নুরজাহান বেগম রানী (৪০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা তিনজনে দাঁড়াল।
গতকাল ভোর সাড়ে চারটার দিকে হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল নামের একটি ছয়তলা ভবনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ভবনের তৃতীয় তলায় মোটর পার্টস ব্যবসায়ী শাখাওয়াত হোসেনের (৪৭) বাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বাড়িতে থাকা ৯ জন দগ্ধ হন। এর মধ্যে শাখাওয়াতের স্ত্রী নুরজাহান গতকাল এবং ছেলে সাফায়াত এবং পর্তুগালপ্রবাসী ভাই সামির আহামেদ আজ মারা যান। ব্যবসায়ী শাখাওয়াতও এ ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন শাখাওয়াত হোসেনের মেয়ে উম্মে আয়মন সানজিদা (০৮), শাখাওয়াতের পর্তুগালপ্রবাসী ভাই সামির আহামেদের স্ত্রী পাখি আক্তার (৩৫), তাঁর ছেলে ফারহান আহমেদ আনাছ (৮), মেয়ে আয়েশা (০৪) ও শাখাওয়াতের আরেক ভাই মো. শিপন হোসাইন (২৫) ।
এদিকে বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি করছে। ফায়ার সার্ভিস এখনো তাদের কমিটির সদস্যদের নাম চূড়ান্ত করেনি। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পক্ষ থেকেও তদন্ত কমিটির বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক কবির উদ্দিন আহম্মদ আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। গ্যাস লিক হয়েছে কি না, সেটি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হয়েছেন। তবে বিষয়টি তদন্ত করে সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি খসড়া করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা ও সময় বিকেলের মধ্যে জানানো হবে।
ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, ওই বাসায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। কোনো কারণে চুলা থেকে হয়তো গ্যাস লিক হয়েছিল, যে কারণে রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। সেই জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হয়েছেন। পুলিশ বলছে, সেখানে আইপিএসের ব্যাটারি দেখা গেছে। অন্যদিকে কেজিডিসিএল গ্যাস লিকের বিষয়ে এখনো তদন্ত শুরু করেনি।
আহত শাখাওয়াত হোসেনের ব্যবসায়িক অংশীদার ও ওই ভবনের সাবেক বাসিন্দা মনসুর আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক বছর হয়েছে আমি এখান থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছি। এই ভবনে আগেও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু গ্যাস বিস্ফোরণের কথা বললে হবে না। এই ভবনে ওভার ভোল্টেজ আছে। তিনজন মারা গেছে এখনো পর্যন্ত। কীভাবে এই বিস্ফোরণ হলো আমরা তার তদন্ত চাই।’
ঘটনার পর গতকাল সরেজমিন হালিমা মঞ্জিলে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের তৃতীয় তলার চারটি ফ্ল্যাটের প্রতিটির দরজা ভাঙা। বিস্ফোরণ ঘটা ঘরটির ভেতরের আসবাব থেকে শুরু ঘরের দেয়াল—সবই পুড়েছে। রান্নাঘরে প্রবেশের পথেই দেখা গেল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রান্নার সামগ্রী। সামনের কক্ষে একটি আইপিএসের ব্যাটারি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পাশের ফ্ল্যাটটির আসবাবও বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
আজ সকালে আরেকবার সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সব ফ্ল্যাটে এক রাতের মধ্যে নতুন দরজা লাগানো হয়েছে। বিস্ফোরণ হওয়া ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা জানান, গতকাল ও আজ নতুন দরজা লাগানো হয়েছে। বিস্ফোরণ হওয়া ফ্ল্যাটটি তালা দেওয়া। দুজন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছেন। এর মধ্যে কোনো সংস্থার লোকজন আসেনি।
গতকাল ঘরের মূল দরজা ভাঙা দেখা গেছে। এ ছাড়া ভেতরের ডাইনিং রুমের বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখা গেছে। রান্নাঘরে রান্নার সামগ্রী লন্ডভন্ড ছিল। রান্নাঘরের পাশে ছোট করিডরে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দেখা গেছে। সেখানেও বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তিনি গাড়ির এসির কাজ করতেন। ঘরে এসির কম্প্রেসর ছিল কি না, সেটি নিশ্চিত না, তবে এসির যন্ত্রাংশ ছিল।
বিষয়টি জানতে চাইলে আহত শাখাওয়াত হোসেনের ব্যবসায়িক অংশীদার মনসুর আলী বলেন, ‘রান্নাঘরের পাশে করিডরটিতে এয়ারকুলার ছিল। কিছু পুড়ে গেছে, কিছু অক্ষত। কম্প্রেসর আমি দেখিনি। রান্নাঘরের জানালা খোলা, সেখানে গ্যাস জমার প্রশ্ন আসে না। গ্যাসের বিস্ফোরণে পুরো ভবনের সব দরজা ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর।’