
সরকারি একটি দপ্তরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করেন আবদুল মজিদ। পঞ্চগড় শহরেই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে। বছরখানেক আগে যা বেতন পেতেন, তা দিয়েই বাড়িভাড়া, সংসার চালানো আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ বাদ দিয়ে কিছু টাকা জমাতে পারতেন তিনি। কিন্তু দিন দিন প্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বাড়ায় এখন টাকা জমানো তো দূরের কথা, কাটছাঁট করে সংসার চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।
গতকাল রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পঞ্চগড় জেলা শহরের কাঁচাবাজারে কথা হয় আবদুল মজিদের সঙ্গে। আট বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মুরগির মাংস কিনতে এসেছেন তিনি। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, সংসারের কোনো হিসাবই মেলানো যাচ্ছে না। বাজারে ঢুকলেই হিমশিম খেতে হয়। মাছ-মাংসের মধ্যে সোনালি আর ব্রয়লার মুরগিই আমাদের অনেকেরই ভরসা ছিল। এই তো মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন আগে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৬০ টাকা ছিল। এখন এক কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ২১০ টাকা। কী খাব আমরা বলেন? কিন্তু বাজারে এসবের তো কারও কোনো তদারকিও দেখি না।’
শুধু আবদুল মজিদই নন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এখন প্রায় সব মানুষেরই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিদিনই দাম বাড়তে থাকা পণ্য কিনে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপাড়ার খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ব্যয় বাড়তে থাকায় এখন লোকজন কোনো হিসাব মেলাতে পারছেন না।
পঞ্চগড়ে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। মুরগির দামও বেড়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। শাকসবজির পাশাপাশি বেড়েছে চাল, চিনি আর সাবান-ডিটারজেন্টের দাম। চিনির কেজি ৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ১১৫ টাকা। প্রতি কেজি ছোলা ১০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে হয়েছে ৯০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজার করতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মাঝে অসন্তোষ আর হতাশা দেখা গেছে। আয় না বাড়লেও দিন দিন জিনিসের দাম বাড়ায় সংসার খরচের অনেকটা কাটছাঁট করতে হচ্ছে তাঁদের। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারিভাবে তদারকের দাবি করেছেন ক্রেতারা।
পঞ্চগড় শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক মাস আগে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা ছিল। এখন ৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকা দরে। এ ছাড়া সোনালি মুরগি ৬০ টাকা বেড়ে হয়েছে ২৯০ টাকা, সোনালি লেয়ারও প্রতি কেজিতে ৮০ থেকে ৯০ টাকা বেড়ে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি ৪০ টাকা বেড়ে ৪৬০ টাকায়, গরুর মাংস প্রকারভেদে ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা। খাসির মাংস প্রকারভেদে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে চালের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি। প্রকারভেদে পাঁচ টাকা বেড়েছে চালের কেজিতে। বিআর-২৮ চিকন চাল ৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ৬৫ টাকা, মোটা চালের মধ্যে (স্বর্ণা) ১৫ দিন আগে ছিল ৪২ টাকা, সেই চাল ৩ টাকা বেড়ে হয়েছে ৪৫ টাকা।
বাজার করতে আসা ইজিবাইকচালক বেলাল হোসেন বলেন, ‘সারা দিন যা আয় করি, বাজার করতে গেলে সব শেষ হয়ে যায়। তখন ঋণের কিস্তি দিতে কষ্ট হয়। এখন তো প্রায় সব জিনিসের দাম দ্বিগুণ। ওষুধ কিনতে গেলে সেটার দামও দ্বিগুণ।’
পঞ্চগড় বাজারের সবজি বিক্রেতা হারুন আর রশিদ বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় বিক্রিও আগের চেয়ে কিছুটা কম। যে ক্রেতা এক কেজি রসুন কিনতেন এখন দাম বাড়ায় তিনি আধা কেজি নিচ্ছেন। আগে ক্রেতারা এসে সরাসরি পণ্য চাইতেন আর এখন আগে দাম জানতে চান।’