
খুলনার কয়রা উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পিচঢালা পথ পেরোলেই টেপাখালী গ্রাম। গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শাকবাড়িয়া নদী পার হলেই সুন্দরবন। টেপাখালী গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, পাঁচ বছর আগে একদিন তাঁর স্বামী আবুল কালাম কিশোর ছেলেকে নিয়ে বনের খালে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। ছেলেকে নৌকায় রেখে খালে নেমেছিলেন তিনি। এর মধ্যে আকস্মিক বাঘের হামলায় প্রাণ যায় কালামের।
মঞ্জুয়ারা বেগম বলতে থাকেন, ছেলে বাড়ি ফিরে খবর জানালে এলাকা থেকে একদল মানুষ সেখানে যান কালামকে উদ্ধার করতে। তবে শুধু কালামের মাথা আর একটা পা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। স্বামী হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা মঞ্জুয়ারাকে নামতে হয় জীবনযুদ্ধে। আশ্রয় নেন বাবার বাড়িতে। তিনি বলেন, ‘সংসারে ছেলে-মেয়ের মুখে দুই বেলা ভাতের জোগান দিতে সেই জঙ্গলকেই বেছে নিয়েছি আমি। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাই। এখন আর জঙ্গলে যেতে ভয় করে না। স্বামীকে হারিয়ে কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরেছি, কিন্তু কেউ কাজ দেয়নি। তাই সেই সুন্দরবনেই যেতে হয়।’
সুন্দরবন–সংলগ্ন কয়রা উপজেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরলে এ রকম অনেক ‘বাঘবিধবা’ নারীর দেখা মেলে। বাঘের থাবায় স্বামী হারানো এসব বিধবা নারীকে এই অঞ্চলে ডাকা হয় ‘বাঘবিধবা’ বলে। তাঁদের কারও স্বামী কাঠ কাটতে গিয়ে, কেউ মাছ ধরতে গিয়ে, কেউ মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের পেটে গেছেন। তাঁদের গল্পগুলো প্রায় একই রকম।
সম্প্রতি ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট নামের একটি বেসরকারি সংগঠন ‘বাঘবিধবা’ নারীদের সংখ্যা বের করেছে। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৭৫ জন ‘বাঘবিধবা’ হয়েছেন কয়রা উপজেলায়।
কয়রা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান কমলেশ কুমার বলেন, পরিবারের কর্মক্ষম মানুষটি বাঘের হামলায় মারা যাওয়ার পর পরিবারে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়। এখন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এসব নারীর কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।