নড়াইল সদর উপজেলায় আধিপত্যের জেরে নিহত তিনজনের মরদেহ সিঙ্গা এলাকায় দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে
নড়াইল সদর উপজেলায় আধিপত্যের জেরে নিহত তিনজনের মরদেহ সিঙ্গা এলাকায় দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে

নড়াইলে সংঘর্ষে নিহত ৪

‘তারে কুপাইয়ে মাইরে ফেলল, এহন ওগের কিডা দেখপে’

‘আমার ভাইয়ের পাঁচজন ছাওয়াল-মাইয়্যে। চার ছাওয়ালের বড়ডার বয়স সাতারো বছর। সেই ছাওয়ালডারে ওরা কুপাইছে। তার অবস্থা বেশি ভালো না। আর সবচেয়ে ছোট মাইয়েডার বয়স মাত্র দেড় মাস। এই ছাওয়াল-মাইয়্যের এহন কী হবে। ওগের বাপই ছেলো পরিবারের একমাত্র আয়ের লোক। তারে কুপাইয়ে মাইরে ফেলল। এহন ওগের কিডা দেখপে।’

মঙ্গলবার সকালে নড়াইল জেলা হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলছিলেন নিহত ফেরদৌস শেখের ছোট ভাই হাসান শেখ। তাঁদের বাড়ি সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলায়।

গতকাল সোমবার ভোরে নিজ বাড়িতে হামলায় নিহত হন ফেরদৌস শেখ ও তাঁদের পক্ষের খলিল শেখ ও তাহাজ্জুদ শেখ। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ, সাহ্‌রির পরপর বাড়িতে হামলা করেন ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা ও তাঁদের লোকজন।

নিহত তাহাজ্জুদ শেখের স্ত্রী সুমী বেগম বলেন, ‘আমরা সাহ্‌রি খায়ে শুয়ে পড়িছি। এর মধ্যি ওরা আইসে কচ্চে, “আমরা আইনের লোক, উইঠে ধরজা খোলো।” এরপর দরজা খুইলে দেহি, আমাগে ঘিরে ফেলিছে। এরপর মারিছে। ও (খায়রুজ্জামান) এট্টা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান (সাবেক) হয়ে এসব করবে? আমরা ওর ফাঁসি চাই। আমরা আর সহ্য করতি পারতিছিনে।’

এ ঘটনায় হামলায় অভিযুক্ত খায়রুজ্জামান মোল্যার পক্ষের একজন আহত হয়ে মারা গেছেন। তাঁর নাম ওসিকুর ফকির। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ খলিলদের হামলায় ওসিকুর নিহত হয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহত চারজনই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁরা ছিলেন পরিবারের উপার্জক্ষম। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, খলিল ও তাঁর স্ত্রী একসঙ্গে থাকতেন। খলিলের আয়ে দুজনের সংসার চলত। আর তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদের সংসারে রয়েছে স্ত্রী ও তিন সন্তান। ছোট সন্তানের বয়স মাত্র আট মাস। তাহাজ্জুদের আয়ের ওপর নির্ভর ছিল পাঁচ সদস্যের এই সংসার। খলিল ও তাহাজ্জুদের মৃত্যুতে এ দুটি পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।

নিহত ফেরদৌসের ভাই হাসান বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মতো খলিল ও তাহাজ্জুদের পরিবারও নিঃস্ব হয়ে গেছে। পরিবারগুলোকে কাজ করে খাওয়ানোর মতো কেউ থাকল না।’
অন্যদিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, নিহত ওসিকুর ফকিরের ছোট ছোট দুটি সন্তান রয়েছে। তিনিও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যরা পথে বসে গেছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরের দিকে নিহত চারজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো মামলা করেনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবার।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) রকিবুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এখন পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এলাকার পরিবেশ শান্ত রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে।